ঢাকা, ২০২০-০৫-২৮ | ১৪ জ্যৈষ্ঠ,  ১৪২৭

ইউপি চেয়ারম্যানের কাণ্ড : ছবি না তোলায় দুস্থদের মারধর (ভিডিও)

প্রকাশিত: ২২:২৮, ১১ এপ্রিল ২০২০   আপডেট: ২২:২৮, ১১ এপ্রিল ২০২০

একেকজন করে লাইন থেকে সামনে আসছেন। হাতের টোকেনটি মাস্ক পরে থাকা লোকটির হাতে তুলে দিলে পাশে থেকে আরেকজন এগিয়ে দিচ্ছেন পাটের একটি ব্যাগ। তাতে ত্রাণের খাদ্যসামগ্রী। তবে চাইলেই তা নিয়ে চলে যেতে পারছেন না ত্রাণ নেওয়া ব্যক্তি। শুরুতে যার হাতে টোকেন তুলে দিয়েছেন তিনি কখনো মাথায়, কখনো ঘাড়ে ধাক্কা দিয়ে ব্যক্তিকে বাধ্য করছেন চলমান ফেসবুক সম্প্রচারে মুখ দেখাতে। কখনো আবার পেছন থেকে বৃদ্ধার শাড়িও টেনে ধরছেন ছবি না তোলায়। ঘটনাটি শুক্রবারের। ঘটেছে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার বোয়ালিয়া ইউনিয়নে। ভিডিওতে মুখ দেখাতে বাধ্যকারী মাস্ক পরা ওই ব্যক্তিটির নাম মহিউদ্দীন বিশ্বাস। তিনি বোয়ালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান।
ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে ত্রাণগ্রহীতা ব্যক্তিরা দুস্থ ও অতিদরিদ্র শ্রেণির মানুষ। বেশির ভাগই বয়োবৃদ্ধ। জরাজীর্ণ পোশাক। শরীর-স্বাস্থ্যও ভালো না। শরীর এতটাই দুর্বল যে কেউ কেউ ত্রাণসামগ্রীর ব্যাগটি তুলতেও হিমশিম খাচ্ছিলেন। মাথা নিচু করে ত্রাণসামগ্রী নিতে গিয়ে ভিডিওতে মুখ না দেখানোয় এক লোকের গালে চেয়ারম্যান মহিউদ্দীন বিশ্বাস এমনভাবে ধাক্কা দেন যে, মুখের মাস্কটি খুলে পড়ে যায়। পড়ে সেটি মেঝে থেকে আরেকজন ছুড়ে বাইরে ফেলে দেন। তারপরই একজন বৃদ্ধা ত্রাণের ব্যাগটি নিয়ে চলে যাওয়ার সময় চেয়ারম্যান পেছন থেকে তার শাড়ির আঁচল টেনে ধরেন। ওই নারী তখনো বুঝে উঠতে পারেননি কেন তাকে পেছন থেকে এভাবে ধরা হলো। পরে ভিডিওকারীর অনুরোধে তাকে যেতে দেওয়া হয়। একই ধরনের দুর্ব্যবহারের আচরণের শিকার হন একজন প্রবীণ নাগরিকও। শিকার হতে হয়েছে রুঢ় বাক্যালাপেরও। ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। শুরু হয় সমালোচনা। কেউ কেউ এই ধরনের অসদ্ব্যবহার ও অশোভন আচরণের বিচার দাবি করেছেন। তবে বিষয়টি উল্টো সাংবাদিকদের ওপর চাপানোর চেষ্টা করেছেন বোয়ালিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মহিউদ্দীন বিশ্বাস। শনিবার তিনি বলেন, ‘ভিডিওটা আমার অফিসের কম্পিউটার অপারেটর অনিক আহমেদ করছিল। ও ভালোভাবেই করছিল। কিন্তু সাংবাদিকরা কাটছাঁট করে দেখিয়েছে। আমি কারো গায়ে হাত দেইনি।’ ত্রাণ বিতরণের ছবি কিংবা ভিডিও করার কোনো বাধ্যবাধকতা স্থানীয় প্রশাসন থেকে ছিল কি না? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘না কেউ বলেনি। দেখি সবাই দেখায়, ত্রাণ দিলাম, তাই দেখালাম।’ কিন্তু ছবি তোলার জন্য শারীরিকভাবে হেনস্তা করা কি ঠিক হয়েছে? ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে আপনি এক ব্যক্তিকে মুখে এমনভাবে আঘাত করেছেন যে তার মাস্কটি খুলে পড়ে গেছে। জবাবে মহিউদ্দীন বিশ্বাস বলেন, ‘না, আমি থাপ্পর দেইনি। এটা ভুল দেখায়েছে। আমি বলেছি ওইদিকে তাকাও। ওদিকে তাকাও। ভিডিওতে দেখাচ্ছে যে গালে চড় মারছে।’ চেয়ারম্যান দাবি করেন, তিনি ৪৫০ ব্যাগ ত্রাণ সামগ্রী পেয়েছিলেন। অথচ মানুষের উপস্থিতি ছিল তিন হাজারের মতো। যে কারণে তিনি সেগুলো বিতরণে হিমশিম খাচ্ছিলেন। তিনি সামাল দিতে পারছিলেন না। তার ভাষায়, ‘কাকে রেখে কাকে দিবো, এই অবস্থা। তখন তাদের বললাম, তোমরা ফাঁকা করে দাঁড়াও। এই হচ্ছে ঘটনা।’ তিনি জানান, প্রতিটি ব্যাগে ছিল ১০ কেজি চাল। তিন কেজি আলু। তিন কেজি ডাল ও দুটি সাবান। এভাবে মানুষকে ভিডিওতে শারীরিক হেনস্তার মাধ্যমে মুখ দেখাতে বাধ্য করার ঘটনাটি যে ঠিক হয়নি, এই অনুধাবনও হয়েছে তার। এনিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনাও তিনি শুনেছেন। যাতে তিনি বিব্রতও। মহিউদ্দীন বিশ্বাস মিনতির সুরে ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘যদি ভুল হয়ে যেয়ে থাকে ক্ষমা চাচ্ছি। জনসাধারণের কাছে মাফ চাচ্ছি। তবে কোনো অনিয়ম হয়নি ভাই, কোনো অনিয়ম হয়নি।’ পরে তিনি মুঠোফোনটি দেন সেই ফেসবুক লাইভকারী ইউপি কার্যালয়ের কম্পিউটার অপারেট অনিক আহমেদের কাছে। এভাবে ফেসবুক লাইভ করে ত্রাণ বিতরণ করতে কারো নির্দেশনা ছিল কিনা, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘চেয়ারম্যান সাবই বলেছিল। আমরা ভালোমতো ফেসবুক লাইভ করেছিলাম। মাল যে বিতরণ করছি, এটা যে সুষ্ঠুভাবে হচ্ছে, এটা দেখাচ্ছিলাম।’ সবাইকে মুখ তুলে ভিডিওতে ছবি দেখাতে বাধ্য করার কাজটি ঠিক হয়েছে কিনা? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘না, আমাদের ভুল হয়ে গেছে। আমরা ফেসবুকে মাফ চেয়েছি।’ বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসনের নজরেও এসেছে। এ ধরনের ঘটনা কাক্সিক্ষত নয় বলে মনে করেন তারা। জানতে চাইলে দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শারমিন আক্তার ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘আমরা কাউকে ভিডিও করে বা ছবি তুলে ত্রাণ বিতরণ করতে বাধ্য করিনি। কেউ যদি প্রমাণ হিসেবে কয়েকটি ছবি তুলে রাখতে চায়, রাখতে পারেন। কিন্তু এভাবে ভিডিওতে মুখ দেখানোর জন্য বাধ্য করা অন্যায় হয়েছে। এটি যিনি করেছেন অন্যায় করেছেন। প্রবীণ নাগরিকের সঙ্গে এমন আচরণ তিনি করতে পারেন না।’ তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আমার নজরে আসার পরই আমি কুষ্টিয়া জেলার ডিডি এলজি মহোদয়কে জানিয়েছি। তিনি জানিয়েছেন এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ এ ব্যাপারে কুষ্টিয়া জেলার স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক মৃনাল কান্তি দে বলেন, ‘আমি জেলা প্রশাসক মহোদয়ের সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বলেছি। বোয়ালিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান কেন মানুষের সঙ্গে অসদ্ব্যবহার করলেন তা জানতে চেয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ করা হবে।’
সর্বশেষ
জনপ্রিয়