ঢাকা, ২০২১-০১-২১ | ৭ মাঘ,  ১৪২৭
সর্বশেষ: 
শেষ রাতে দু’রাকাত নামাজ জীবন পরিবর্তন করে দিতে পারে নতুন করোনাভাইরাস আতঙ্কে ইউরোপ-আমেরিকার শেয়ারবাজারে ধস জুনের মধ্যে আসছে আরও ৬ কোটি করোনার টিকা বাড়িভাড়ায় নাভিশ্বাস, ফের বাড়ানোর পাঁয়তারা অমিতাভের পর অভিষেকও করোনা আক্রান্ত বিশ্ব ধরেই নিচ্ছে বাংলাদেশ জালিয়াতির দেশ : শাহরিয়ার কবির ইরাকে মর্গের পাশে রাত কাটছে বাংলাদেশিদের! বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শক বাংলাদেশের সেঁজুতি সাহা সাহেদর টাকা থাকত নাসির, ইন্ডিয়ান বাবু ও স্ত্রী সাদিয়ার কাছে ‘বাংলাদেশিদের ভোট দিন’ মানবতার সেবায় কমিউনিটি নেতৃবৃন্দ অনিশ্চিতায় ফেরদৌস খন্দকার কৃষ্ণাঙ্গ হত্যা থামছেই না বিক্ষোভ অব্যাহত গভর্নরের সিদ্ধান্ত মানছে না মেয়র অভিবাসীরা জিতলেন হারলেন ট্রাম্প করোনার ধাক্কা - মে মাসে রপ্তানি কমেছে ২০ হাজার কোটি টাকার পুলিশ সংস্কার বিল উঠলো মার্কিন কংগ্রেসে লাইফ সাপোর্টে থাকা নাসিমের জন্য মেডিকেল বোর্ড পুনর্গঠন আইসিইউ নিয়ে হাহাকার ঈদের ছুটিতে অনিরাপদ হয়ে উঠছে গ্রামগুলো ঘরে ঘরে ভুতুড়ে বিল, বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে সমন্বয় হবে নিউইয়র্কে ‘ট্রাম্প ডেথ ক্লক’ নিউইয়র্কে জেবিবিএ’র পরিচালক ইকবালুর রশীদ লিটনের মৃত্যু নিজ আয়ে চলা শুরু করলো বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি কবে খুলবে নিউইয়র্ক নিউইয়র্কে এবার নতুন ভাইরাসে শিশুরা আক্রান্ত

শিশুদের নিয়ে স্বপ্ন দেখে খুদে বাঙালি ফাতিহা

প্রকাশিত: ০৮:৩৪, ৬ জানুয়ারি ২০২১  

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মার্কিন ৯ বছর বয়সী ফাতিহা আয়াত নিউইয়র্ক নগরের গিফ্টেড অ্যান্ড ট্যালেন্টেড প্রোগ্রামের চতুর্থ গ্রেডের ছাত্রী। জাতীয় পর্যায়ে গণিত প্রতিযোগিতায় এরই মধ্যে সে পেয়েছে অনারেবল মেনশন। জাতিসংঘের বিভিন্ন সম্মেলনে নিয়মিত যোগ দিয়ে কথা বলে সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের অধিকার নিয়ে। তার বয়সী শিশুদের জন্য গণিত, কোডিং, বিজ্ঞান, নিউজ, কোরআন শরিফের তাফসির, সমসাময়িক নানা বিষয় নিয়ে ইউটিউবে কনটেন্ট আপলোড করে। ভালোবাসে ছবি আঁকতে আর চিঠি লিখতে।

যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হলেও পিতৃভূমির প্রতি রয়েছে তাঁর অসীম ভালোবাসা। তাই তো সাত বছর বয়সী ফাতিহা জাতিসংঘে রোহিঙ্গাদের কারণে বাংলাদেশের বনাঞ্চল ধ্বংস এবং বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে এর ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে বক্তৃতা করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় পর্যায়ের এক গণিত প্রতিযোগিতায় তাকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, এটিতো আন্তর্জাতিক কোনো ইভেন্ট নয়, তা সত্ত্বেও তুমি বাংলাদেশের পতাকা বহন করছ কেন? তার সাবলীল উত্তর, ‘আমার পূর্বসূরির দেশের কেউ যেহেতু আগে কখনো এই প্রতিযোগিতায় জয়ী হয়নি, তাই আমি নিজের এই অর্জনকে তাদের সবার অর্জন বলে মনে করছি। এই পুরস্কার আমি বাংলাদেশের সব গণিতপ্রেমী শিক্ষার্থীদের উৎসর্গ করছি।’

এই হলো বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফাতিহা আয়াত। এ দেশে বসবাস করলেও তার হৃদয়ে সমুজ্জ্বল বাংলাদেশ। কীভাবে জাতিসংঘে প্রথম গেল সে সম্পর্কে ফাতিহা জানাল, ১১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক কন্যা শিশু দিবস। জাতিসংঘ নানা ব্যস্ততার কারণে ২০১৭ সালের আন্তর্জাতিক কন্যা শিশু দিবসের অনুষ্ঠান আয়োজন করে দুই দিন পর ১৩ অক্টোবর। এই ১৩ অক্টোবর আবার তার জন্মদিন। সে বছর বাবা-মা জন্মদিনের উপহার হিসেবে তাকে কোনো একটা চমক দিতে চেয়েছিলেন। তাই তারা ওই অনুষ্ঠানের আয়োজকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাকে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের ইকোসক চেম্বারে নিয়ে যায়।

ফাতিহা বলেন, ‘সেই অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি কানাডার নারীবিষয়ক মন্ত্রী মারিয়াম মোনসেফ ভাষণে আমার কথা উল্লেখ করেন এবং হলভর্তি বিভিন্ন দেশের সরকারের প্রায় সাত শ ঊর্ধ্বতন কর্তাব্যক্তি আমাকে করতালি দিয়ে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানান। এরপর থেকেই জাতিসংঘের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার প্রতি আমার আগ্রহ জন্মায় এবং একের পর এক সুযোগও আসতে থাকে।

ফাতিহা সর্বশেষ জাতিসংঘে ভাষণ দেয় গত ১২ আগস্ট বিশ্ব যুব দিবসের অনুষ্ঠানে। সেখানে উপস্থিত জাতিসংঘের সহকারী অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনারেল সত্য ত্রিপাঠি তার ভাষণে ফাতিহার কথা উল্লেখ করেন। এর আগে ফাতিহা ১৬তম আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সম্মেলন ২০১৯, জাতিসংঘ দিবস ২০১৭ এবং উইমেন পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাজেন্ডা ২০১৭–এ অংশ নেয়। এসব অনুষ্ঠানে ফাতিহা শিশু নির্যাতন, লিঙ্গবৈষম্য, পারিবারিক সহিংসতা, শরণার্থীশিবিরে অমানবিক জীবন ও শিশুদের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে কথা বলে। এমনকি ফাতিহা যেসব গণিতের প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়, সেখানেও সে শিশুদের আনন্দময় শিক্ষার অধিকার নিয়ে কথা বলে।

গণিত প্রসঙ্গে ফাতিহা জানায়, যেকোনো প্রতিযোগিতায় শুরুর দিকে সে সব সময় খুব নার্ভাস থাকে। তাকে নার্ভাস হতে দেখলেই তার বাবা রেগে যায়। তার বাবা আত্মবিশ্বাসী থাকার কোনো বিকল্প ভাবতে পারে না। ফাতিহার মা তখন তাকে সাহস দেয়। যেমন ২০১৭ সালের ন্যাশনাল ম্যাথমেটিক্স পেন্টাথলন অ্যাকাডেমিক টুর্নামেন্টে ইভেন্ট ছিল পাঁচটি। ফাতিহা প্রথম দুটি ইভেন্টেই হেরে যায়। কারণ, সে ভীষণ নার্ভাস ছিল। তার বয়স তখন সাড়ে পাঁচ বছর, একেতো জীবনের প্রথম কোনো গণিত টুর্নামেন্ট, তাও আবার এত বড় মাপের জাতীয় আসর। মা তাকে খুব সাহস দেয়, অনেক আদর করে। তারপর ফাতিহা বাকি তিনটি ইভেন্টে জয়ী হয়ে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ওই প্রতিযোগিতায় ‘অনারেবল মেনশন’ খেতাব অর্জন করে। এ ছাড়া সে জেইআই ম্যাথ অলিম্পিয়াড ২০১৯, ন্যাশনাল ম্যাথ ফেস্টিভ্যাল ২০১৯, গ্লোবাল ম্যাথ উইক ২০১৭–এ অংশ নেয়।

ফাতিহার করা কিছু ভিডিও টিউটোরিয়াল আছে তার ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেল। তাদের বাসায় লিভিং রুমের এক কোনায় তার স্টুডিও আছে। আগে বাবা-মা সাহায্য করত, এখন সে নিজেই সাজগোজ করে লাইট-ক্যামেরা রেডি করে ভিডিও রেকর্ড করে, নিজেই প্রিমিয়ার প্রো অথবা ফাইনাল কাট প্রো’–তে এডিট করে নিজেই ভিডিও আপলোড করে। গণিত ছাড়াও ফাতিহা বিজ্ঞান, ভূগোল, কোডিং, কোরআনের তাফসির, সমসাময়িক নানা বিষয় নিয়েও বিভিন্ন কনটেন্ট আপলোড করে। কাশ্মীর ইস্যুতে ফাতিহার যেমন ভিডিও আছে, তেমনি গার্বেজ ট্রাকের বিষয়ে নিউইয়র্কের মেয়রকে লেখা তার চিঠি এবং তিনি যে উত্তর দিয়েছেন সেটা নিয়েও ভিডিও আছে। আমাজনে ফাতিহার দুটি বই আছে, যার মোড়ক উন্মোচন করেন কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক।

নাসায় গিয়ে নভোচারী ডন থমাসের, ন্যাশনাল সায়েন্স ফেস্টিভ্যালে নভোচারী নিকল স্টট আর সায়েন্স পোর্টে গিয়ে বিজ্ঞানী ন্যাথান রুথম্যানের সঙ্গে দেখা করার পর থেকে ফাতিহা নভোচারী হতে চাইত। মনে হতো, মহাকাশ থেকে পৃথিবী দেখার চেয়ে আনন্দের বুঝি আর কিছু হতে পারে না। কিন্তু প্রথম রোজা রাখার সেই দিনটার পর থেকে সে আর নভোচারী হতে চায় না। এখন সে চায় বড় হয়ে এমন কিছু করে বিশ্ব সভ্যতায় অবদান রাখতে, যেন আর একটি শিশুও ক্ষুধা বা তৃষ্ণায় একটি দিনও না কাটায়। সেটা নানাভাবেই হতে পারে। যেমন, সে যদি ভূতাত্ত্বিক প্রকৌশলী হয়, বৃষ্টির পানি নষ্ট না করে আরও বেশি করে ব্যবহারের জন্য রেইন ওয়াটার রিজার্ভার বানাবে, যা পৃথিবীর সব অঞ্চলের শিশুর তৃষ্ণা মেটাবে। জেনেটিক সায়েন্টিস্ট হলে বিভিন্ন খাবারের ডিএনএ প্রোফাইল আবিষ্কার করে সেগুলোকে শিশুদের জন্য আরও বেশি পুষ্টিকর করবে। মোট কথা, সে যা-ই হোক, সে চায় পেশাটা হোক শিশুদের জন্য।
বিজ্ঞাপন

ফাতিহা জানায়, ‘চার বছর বয়সে আমি যখন যুক্তরাষ্ট্রে আসি, তখন থেকেই আমার ফার্স্ট ল্যাঙ্গুয়েজ যেন ইংরেজি হয়ে না যায়, সে বিষয়ে বাবা-মা ভীষণ নজর দিতেন। বাবা প্রতিদিন আমাকে সঙ্গে নিয়ে বিবিসি বাংলার খবর শোনেন, সেখানে কিছু না বুঝলে আমি বাবাকে জিজ্ঞেস করি। মায়ের সঙ্গে আমি প্রতি উইকেন্ডে বাংলা সিনেমা দেখি। আমি বাংলা পড়তে ও লিখতে পারি। নিউইয়র্কে থাকলেও আমি বাংলাদেশের বোর্ডের পাঠ্যপুস্তক নিয়মিত পড়ি।’

ফাতিহা জানায়, ‘আমি অনেক চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয়েছি। বাবার অফিস সাজানো আমার পেইন্টিং দিয়ে। স্কুলের বিভিন্ন লিফলেট ও ম্যাটেরিয়ালে টিচাররা আমার আঁকা ছবি ব্যবহার করে। আমি গল্পের বই পড়া শেষে আইপ্যাডে প্রোক্রিয়েট অ্যাপস ব্যবহার করে সেগুলোর প্রচ্ছদ করি। আমি অনেককেই চিঠি লিখি। সম্প্রতি আমি আলাস্কা বেড়াতে গিয়েছি। ফিরে এসে সেখানে পরিচয় হওয়া ফরেস্ট রেঞ্জার, গ্ল্যাসিয়ার পাইলট, অ্যাডভেঞ্চার গাইড, ইকো আর্টিস্টদের চিঠি লিখেছি ও তাদের সঙ্গে তোলা ছবি পাঠিয়েছি।

সে যেদিন প্রথম রোজা রাখে, সে দিন খুব খেতে চেয়েছিল। ইফতারের আগে ফাতিহার মনে হচ্ছিল, বুঝি পৃথিবীর সব খাবার আর পানি সে খেয়ে ফেলবে। তার বাবা তখন তাকে বলেছেন, তার সেদিন যেমন ক্ষুধা লেগেছে, তেমনই ক্ষুধা–তৃষ্ণায় প্রতিদিন কাতর থাকে ইয়েমেন, সিরিয়া, ফিলিস্তিন, সোমালিয়া, ইথিওপিয়ার তার বয়সী হাজারো শিশু। সেদিন থেকেই ফাতিহা তার স্বপ্ন বদলে ফেলেছে।

নিউইয়র্ক বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
সর্বশেষ
জনপ্রিয়