ঢাকা, ২০২০-১০-২০ | ৫ কার্তিক,  ১৪২৭
সর্বশেষ: 
অমিতাভের পর অভিষেকও করোনা আক্রান্ত বিশ্ব ধরেই নিচ্ছে বাংলাদেশ জালিয়াতির দেশ : শাহরিয়ার কবির ইরাকে মর্গের পাশে রাত কাটছে বাংলাদেশিদের! বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শক বাংলাদেশের সেঁজুতি সাহা সাহেদর টাকা থাকত নাসির, ইন্ডিয়ান বাবু ও স্ত্রী সাদিয়ার কাছে ‘বাংলাদেশিদের ভোট দিন’ মানবতার সেবায় কমিউনিটি নেতৃবৃন্দ অনিশ্চিতায় ফেরদৌস খন্দকার কৃষ্ণাঙ্গ হত্যা থামছেই না বিক্ষোভ অব্যাহত গভর্নরের সিদ্ধান্ত মানছে না মেয়র অভিবাসীরা জিতলেন হারলেন ট্রাম্প করোনার ধাক্কা - মে মাসে রপ্তানি কমেছে ২০ হাজার কোটি টাকার পুলিশ সংস্কার বিল উঠলো মার্কিন কংগ্রেসে লাইফ সাপোর্টে থাকা নাসিমের জন্য মেডিকেল বোর্ড পুনর্গঠন আইসিইউ নিয়ে হাহাকার ঈদের ছুটিতে অনিরাপদ হয়ে উঠছে গ্রামগুলো ঘরে ঘরে ভুতুড়ে বিল, বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে সমন্বয় হবে নিউইয়র্কে ‘ট্রাম্প ডেথ ক্লক’ নিউইয়র্কে জেবিবিএ’র পরিচালক ইকবালুর রশীদ লিটনের মৃত্যু নিজ আয়ে চলা শুরু করলো বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি কবে খুলবে নিউইয়র্ক নিউইয়র্কে এবার নতুন ভাইরাসে শিশুরা আক্রান্ত

আইসিইউ নিয়ে হাহাকার

প্রকাশিত: ০৬:০৩, ৯ জুন ২০২০  

রোগী নিয়ে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে দৌড়াচ্ছেন স্বজনরা কোথাও খালি নেই আইসিইউ বেড ভয়াবহ বিপর্যয় আসছে—বলছেন চিকিত্সকরা

করোনার প্রাদুর্ভাবে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ বেডের জন্য হাহাকার চলছে। কোথাও সিট খালি নেই। একটা আইসিইউ বেড যেন সোনার হরিণ। আইসিইউ সাপোর্টের অভাবে রোগীরা রাস্তায় মারা যাচ্ছে। পিতার কোলে সন্তান, ভাইয়ের সামনে বোনের করুণ মৃত্যু হচ্ছে। বর্তমানে আইসিইউতে একটি সিটের জন্য ১৫ জন রোগী অপেক্ষা করছে। সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে কান পাতলেই এখন শোনা যায় আইসিইউয়র জন্য স্বজনদের হাহাকার। সাধারণ মানুষের এই আর্তিতে বিব্রত হন চিকিত্সকরা। কেবল চেয়ে দেখা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না তাদের। আইসিইউ বেডের অভাবে চোখের সামনে রোগীকে মরতে দেখার চিত্র এখন তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে গেছে।

খোদ চিকিৎসকরাই পাচ্ছেন না আইসিইউ বেড। সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মঈন উদ্দিন নিজের কর্মস্থলে আইসিইউ পাননি। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আনা হলে গত ১৫ এপ্রিল কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে মারা যান তিনি। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে প্রতিদিন ৫০ জন করোনা রোগীর আইসিইউ সাপোর্টের প্রয়োজন বলে চিকিৎসকরা লিখে দিচ্ছেন। কিন্তু কোনো সিট খালি নেই। আইসিইউ সাপোর্ট না পেয়ে শনিবার এক জন রোগী মারা গেছেন। বিশেষজ্ঞরা বলেন, যার আইসিইউ প্রয়োজন তাকে আইসিইউতেই চিকিৎসা দিতে হবে।

এদিকে করোনা রোগীদের চিকিৎসায় দারুণ একটা মডেল তৈরি করেছে এলিট ফোর্স র‌্যাব। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, ‘বিশুদ্ধ অক্সিজেন পেলে ৯০ শতাংশ রোগীই সুস্থ হয়ে যায়।’ সেই বিশুদ্ধ অক্সিজেন তৈরির নতুন মডেলে তেমন কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধান ছাড়াই র‌্যাবে অর্ধশতাধিক সদস্য সুস্থ হয়ে উঠেছেন। পল্টনের একটি কমিউনিটি সেন্টারকে অস্থায়ী হাসপাতাল বানিয়ে সেখানে বসানো হয়েছে ‘কনসেনট্রেটর’ মেশিন। এই মেশিনে টানা অক্সিজেন তৈরি করা হচ্ছে। অস্থায়ী এই হাসপাতালে ডাক্তার, নার্স সবাই র্যাবের সদস্য। তাদের মধ্যে বিশেষজ্ঞ কোনো চিকিত্সক নেই। তারপরও সব সদস্যকে সুস্থ করে তুলেছেন তারা। এই পদ্ধতি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত বিশ্বের অন্যান্য দেশও ব্যবহার করছে। এই মেশিনে উত্পাদিত অক্সিজেনের ৯৫ শতাংশই বিশুদ্ধ। এই মেশিনের মূল্য মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে। বাংলাদেশের বেসরকারি হাসপাতাল, জেলা সদর হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও হেলথ কমিউনিটি ক্লিনিক এই মেশিন ব্যবহার করে সুচিকিৎসা দিতে পারে।

র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) মহাপরিচালক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, করোনা ভাইরাস আক্রান্ত রোগীরা হাসপাতালের দিকে বেশি না ঝুঁকে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সেবা নিতে পারেন। এক্ষেত্রে ‘কনসেনট্রেটর’ মেশিন ব্যবহার করা যেতে পারে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলেন, র‌্যাব বৈজ্ঞানিক কোনো সংগঠন নয়। তারপরও নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় করোনা চিকিৎসায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে তারা। র‌্যাব পারলে দেশের স্বাস্থ্য বিভাগ পারবে না কেন?

জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সহিদুল্লাহ জানান, চীন সেন্ট্রাল অক্সিজেনের ব্যবস্থা করেছে দ্রুত। হাই ফ্লো অক্সিজেন ব্যবস্থা চালু আছে। কিন্তু আমাদের দেশে হাই ফ্লো অক্সিজেন নেই। পরামর্শক কমিটি এ ব্যাপারে কয়েক দফা প্রস্তাবও দিয়েছে। কিন্তু বিষয়টি আমলে নেওয়া হয়নি। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ ও জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. খান মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘আমরা রোগীদের জায়গা দিতে পারি না। চোখের সামনে দেখছি রোগীরা চিকিৎসা পাচ্ছেন না। নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করতে হচ্ছে। এটা অনেক কষ্টের। প্রতিটি বেডের সঙ্গে হাই ফ্লো অক্সিজেনের ব্যবস্থা চালু প্রয়োজন।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, দ্রুত হাই ফ্লো অক্সিজেন ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিদেশ থেকে আনার ব্যবস্থা করছি। বাজারে পাওয়া গেলে স্থানীয় হাসপাতালগুলোকে তা ক্রয় করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ সোসাইটি অব অ্যানেসথেসিওলজিস্টের সভাপতি বিএসএমএমইউর অ্যানেসথেসিয়া, এনালজেসিয়া অ্যান্ড ইনটেনসিভ কেয়ার মেডিসিন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. দেবব্রত বণিক বলেন, আইসিইউয়ের জন্য ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। রোগীরা তো পাচ্ছেই না, এমনকি করোনা আক্রান্ত ডাক্তাররাও আইসিইউ বেড পাচ্ছেন না। এই মুহূর্তে তিন জন ডাক্তার আইসিইউ বেড পাওয়ার অপেক্ষায় আছেন। তারা হলেন কিডনি ইনস্টিটিউটের সাবেক অধ্যাপক ডা. শাহ আলম, মিটফোর্ড হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম ও ইএনটির অধ্যাপক ডা. সাজ্জাদ হোসেন। তিনি বলেন, করোনা যখন প্রথম শুরু হয়, তখন আমেরিকা দিগ্বিদিক হারিয়ে ফেলেছিল। অপারেশন থিয়েটার পর্যন্ত তারা আইসিইউ করে ফেলে। পরে বেডগুলোও আইসিইউ করে ফেলেছে। আমাদের এখন জরুরি ভিত্তিতে আইসিইউ সম্প্রসারণ করতে হবে।

করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় গঠিত জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটির সদস্যরা বলেন, পর্যাপ্ত আইসিইউ ও হাই ফ্লো অক্সিজেনের ব্যবস্থা আমরা এত দিনে করতে পারিনি কেন? বিশ্বের কোনো দেশেই করোনা ভাইরাস মোকাবিলার প্রস্তুতি আগে থেকে ছিল না। কিন্তু ভাইরাসটি আসার পর তারা প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। অনেক দেশ তাদের পুরো হাসপাতালকে আইসিইউ করে ফেলেছে। বেডের সঙ্গে হাই ফ্লো অক্সিজেনের ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু বাংলাদেশ অনেক সময় পাওয়ার পরও কেন প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে পারেনি? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার করোনা মোকাবিলায় অর্থ বরাদ্দ দেওয়া সহ সবকিছু করার নির্দেশনা দিয়েছেন। কিন্তু সংশ্লিষ্টদের সমন্বয়হীনতা ও গালিফতির কারণে দেশের চিকিত্সা ব্যবস্থায় এই অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

রাজধানীর সব কটি হাসপাতালেই আইসিইউর জন্য মাতম। দেশে বর্তমানে করোনা রোগীর চিকিৎসায় পূর্ণ আইসিইউ বেড রয়েছে ৩৯৯টি। এর মধ্যে যান্ত্রিক ত্রুটি, অভিজ্ঞ টেকনিশিয়ানের অভাব এসব কারণে ৫০টিরও বেশি বন্ধ রয়েছে। আবার ভিআইপি কোটা এবং বিত্তশালীদের বুকিংয়ে রয়েছে আরো অন্তত ৫০টি। যেভাবে সংক্রমণ বাড়ছে তাতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, আক্রান্তের ৫ শতাংশও যদি গুরুতর পরিস্থিতির শিকার হয় বাংলাদেশের পক্ষে সেটি মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। রবিবার ঘরোলাল রায় নামক এক শিক্ষক তার মেয়ের জন্য আইসিইউ বেড পেতে ইত্তেফাকের সাহায্য চেয়েছেন। করোনায় আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর কুয়েত বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালে তার মেয়ে চিকিৎসাধীন। বণিক নামে এক ব্যবসায়ী ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আইসিইউ বেড না পেয়ে যান উত্তরায় রিজেন্ট হাসপাতালে। তবে সেখানে আছে মাত্র দুটি বেড। তাও খালি নেই। বণিকও আইসিইউ বেড পেতে ইত্তেফাকের সহযোগিতা চান।

এভাবে গতকাল ৫০ থেকে ৬০ জন রোগী ও তাদের স্বজনরা আইসিইউ বেড পেতে সহযোগিতা চেয়েছেন ইত্তেফাকের কাছে। বৃহস্পতিবার রাত ২টার পর করোনার সঙ্গে লড়াইয়ে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) মারা যান তিন জন। র্যাবের এক জন কর্মকর্তার আত্মীয়ের অক্সিজেনের প্রয়োজন হয়। কিন্তু কোনো হাসপাতালে ব্যবস্থা হয়নি। পরে অক্সিজেনের অভাবে তিনি মারা যান। র্যাব কর্মকর্তার ওই আত্মীয় এক জন ব্যবসায়ী। সিনিয়র সাংবাদিক আব্দুল মোনায়েম করোনায় আক্রান্ত হয়ে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। তার আইসিইউ সাপোর্টের প্রয়োজন হলেও বেড খালি ছিল না। পরে ভর্তি এক রোগীর কাছে থেকে কিছু সময়ের জন্য আইসিইউ ধার নিয়েও বাঁচতে পারেননি তিনি। এদিকে বিভিন্ন হাসপাতালে বেড খালি থাকলেও করোনা রোগীদের ভর্তি নেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত এক সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন গড়ে আড়াই হাজার শনাক্ত রোগী পাওয়া যাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ৫ শতাংশের যদি আইসিইউ প্রয়োজন হয় তাহলে প্রতিদিন ১২৫ জনের আইসিইউ সাপোর্ট দরকার। আর চার দিনে দরকার হবে ৫ শতাধিক। তারা বলেন, এটা তো আমরা বললাম একেবারে অন্তিম পর্যায়ের মানুষগুলোর কথা। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, মূলত ২০ শতাংশেরই কোনো না কোনোভাবে আইসিইউ দরকার হয়। সে ক্ষেত্রে বর্তমান যে পরিস্থিতি তাতে আইসিইউ বেড দরকার আড়াই থেকে ৩ হাজার। আর পরিস্থিতির অবনতি হলে আরো কয়েক গুণ সাপোর্ট লাগতে পারে।

গত দুদিন ধরে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন করোনা বিশেষায়িত হাসপাতালের চিকিত্সক, নার্স এবং আক্রান্ত রোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আইসিইউর জন্য মানুষ হন্য হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতাল। আবার সঠিক সময়ে রোগীদের আইসিইউ সাপোর্ট দিতে না পারা এবং এ কারণে মৃত্যুর ঘটনায় চিকিত্সক-নার্সরা মানসিক শক্তি হারিয়ে ফেলছেন। কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতালের চিকিত্সকরা বলেন, আইসিইউ দিনে দিনে বড় সংকট হয়ে যাচ্ছে। কেউ সুস্থ হয়ে ফিরলে অথবা মারা গেলে চিকিত্সারতদের মধ্য থেকে যাদের পরিস্থিতি বেশি জটিল তাদের দেওয়া হয়।

সর্বশেষ
জনপ্রিয়