শনিবার, ১৪ এপ্রিল ২0১৮, Current Time : 1:20 am




জয়তু মহান স্বাধীনতা দিবস

সাপ্তাহিক আজকাল : 24/03/2018


মনজুর আহমদ :
২৫ মার্চের বিভীষিকাময় রাতের ভয়ঙ্কর বীভৎসতার পর ২৬ মার্চ বাংলাদেশ ছিল স্বাধীন। বাংলাদেশের মানুষ সেদিন থেকে অস্বীকার করেছিল পাকিস্তানের অধীনতা। তবে স্বাধীনতার সুবাতাসে অবগাহন করতে বাঙালিকে পাড়ি দিতে হয়েছে রক্তাক্ত আরো নয়টি মাস। মার্চ থেকে ডিসেম্বর। এই সময়টিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ‘যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলায়’ ঝাঁপিয়ে পড়েছিল বাংলার মানুষ। ১৬ ডিসেম্বর দেশ মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশের বুকে এই নয়টি মাস জুড়ে ছিল রুদ্ধশ্বাস জীবন, অস্ত্র হাতে রক্তক্ষয়ী মুক্তির যুদ্ধ, অগণিত মানুষের আত্মাহুতি, হানাদারদের নৃশংসতা, বুদ্ধিজীবী হত্যাযজ্ঞ, ঘরে ঘরে হাহাকার, দেশ জুড়ে স্বজন হারানোর কান্না। এই সব দুঃখ-বিষাদ, অনিশ্চয়তা, অসহায়তাই ছিল মানুষের সেই দুঃসময়ের দিনগুলির নিত্য সঙ্গী।
এই ঝঞ্ঝামুখর জীবনে একটি প্রত্যাশাতেই উদ্দীপ্ত ছিল দেশের মানুষ। স্বাধীনতা। সবাই অকাতরে ত্যাগ স্বীকার করেছে একটি স্বপ্ন নিয়েই, স্বাধীনতা। পরাজয় নিশ্চিত জেনে শেষ আঘাতটা হানাদারদের সহযোগী আলবদর-রাজাকাররা করেছিল আত্মসমর্পনের মাত্র দুদিন আগে। কার্ফিউয়ের কাঁটাতারে আবদ্ধ ঢাকা শহরের বাড়ি বাড়ি হানা দিয়ে তারা তুলে নিয়ে গিয়েছিল বুদ্ধিজীবীদের। ওরা আর ফিরে আসেননি। রায়েরবাজার ইটখোলা, মিরপুরের শিয়ালবাড়িতে পাওয়া গিয়েছিল অনেকের ক্ষতবিক্ষত লাশ।
তারপরও স্বাধীনতার আনন্দ। স্বাধীনতা বাঙালির এক বিরাট প্রাপ্তি। এই অসাধারণ প্রাপ্তির প্রলেপে ঢাকা পড়ে গিয়েছিল নয় মাসের সকল ক্ষত। স্বাধীনতার আনন্দে মানুষ ভুলতে চেয়েছিল হারানোর বেদনা। স্বাধীনতা, হাজার বছরের ইতিহাসে বাঙালির শ্রেষ্ঠ অর্জন। একক জাতি হিসাবে বাঙালির প্রথম একটি একক স্বাধীন রাষ্ট্র, বাংলাদেশ।
বাঙালির গৌরবময় সেই স্বাধীনতার ৪৭তম বার্ষিকী আগামী ২৬ মার্চ, সোমবার। বাংলাদেশের মানুষ এদিন নতুন করে উদ্বেলিত হয়ে উঠবে স্বাধীনতার চেতনায়, নতুন করে উজ্জীবিত হবে মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলি স্মরণে। প্রতি বছরের মতো এবারও দেশ ও প্রবাসের বাংলাদেশিরা যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপন করবে স্বাধীনতার এই দিনটি। একই সঙ্গে প্রতি বছরের মতো এ বছরও তারা হিসাব-নিকাশ করবে স্বাধীনতার প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি নিয়ে।
স্বাধীনতার এই ৪৭ বছরে আমরা কি পেলাম এই চিরন্তন প্রশ্নের যথার্থ জবাব নিশ্চয় এবারও নতুন পরিপ্রেক্ষিতে খুঁজে ফেরা হবে। ঘটনাবহুল বিগত বছরটি গুরুত্ব পাবে বিভিন্ন আলোচনায়। দাবী উঠবে নানা ক্ষেত্রে বিপুল সাফল্যের। অভিযোগও উঠবে নানা অনিয়ম-অনাচার, ব্যর্থতার। এ বিতর্ক বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের নৈমিত্তিক বিষয়। তবে এই স্বাধীনতার মাসে এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল কাতারে বাংলাদেশের উন্নয়নের সাফল্য পর্যালোচনায় দেশের অর্থনীতিবিদদের মূল্যায়ণ বিশেষ প্রণিধানযোগ্য। তারা এ সাফল্যকে গৌরবজনক হিসাবে অভিহিত করে সাথে সাথে সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেছেন, এ সাফল্যকে ধরে রাখতে দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব আরোপ করতে হবে। আর এই সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখা জরুরী বলে তারা মন্তব্য করেছেন।
সুশাসন ও গণতন্ত্র এই দুটিই আজকের বাংলাদেশে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। দেশের বাহ্যিক অবকাঠামোগত উন্নয়নের যে দাবী আজ সগর্বে উচ্চারিত হচ্ছে তা বস্তুত ম্লান হয়ে যাচ্ছে বিরাজিত সামাজিক-রাজনৈতিক অবনতিশীল পরিস্থিতির কারণে। দেশে আজ প্রকৃত অর্থে বিরোধী দলকে অস্তিত্বহীন করে দেয়া হয়েছে। বিপন্ন করে তোলা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ গণতন্ত্রকে। দূর্নীতি আজ সর্বব্যাপ্ত। অভিযোগ উঠেছে শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করার, ব্যাংকিং সেক্টরকে ধসিয়ে দেয়ার।
৪৭তম স্বাধীনতার এই বছরটি আর একটি কারণে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এ বছরটি জাতীয় নির্বাচনের বছর। সবার উদ্বেগ, কেমন হবে এ বছরের নির্বাচন? এবারের নির্বাচনও কি হবে ২০১৪ সালের মতো একতরফা? সকল দল বিশেষ করে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি’র অংশগ্রহণে নির্বাচন অনুষ্ঠানের সম্ভাবনা এখনও ক্ষীণ। খালেদা জিয়ার কারাদন্ড এবং নতুন নতুন মামলা দিয়ে জামিন সত্ত্বেও আবারও গ্রেফতার দেখিয়ে তাকে যেভাবে হেনস্থা করা হচ্ছে তাতে বিএনপিকে নির্বাচনে আনার ব্যাপারে সরকারের সদুদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ প্রকাশের অবকাশ রয়েছে। একই সঙ্গে মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে ক্ষমতাসীনদের বিশেষ করে তাদের অঙ্গ সংগঠন ছাত্রলীগ-যুবলীগের বেপরোয়া দৌরাত্ম্যে।
সব মিলিয়ে দেশের মানুষ যে এক হতাশার মধ্যে বাস করছে এ কথা বলা নিশ্চয় অসমীচীন হবে না। এবারের স্বাধীনতা দিবসে তাই আমাদের প্রত্যাশা- দেশে প্রতিষ্ঠা পাক সুশাসন, নিশ্চয়তা বিধান করা হোক মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারের। দেশ উজ্জীবিত হয়ে উঠুক মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনায়। আমরা সবাই একযোগে সোচ্চারে ও সানন্দে বলতে চাই- ‘জয়তু স্বাধীনতা দিবস’।
লেখক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক; সম্পাদক, সাপ্তাহিক আজকাল, নিউইয়র্ক।



Chief Editor & Publisher: Zakaria Masud Jiko
Editor: Manzur Ahmed
37-07 74th Street, Suite: 8
Jackson Heights, NY 11372
Tel: 718-565-2100, Fax: 718-865-9130
E-mail: ajkalnews@gmail.com
� Copyright 2009 The Weekly Ajkal. All rights reserved.