রবিবার, ১৫ এপ্রিল ২0১৮, Current Time : 1:24 am
  • হোম »এই সপ্তাহের খবর» জ্যাকসন হাইটসে জানাজায় সর্বস্তরের মানুষের ঢল
    সাঈদ রহমান মান্নানের জন্য কমিউনিটির কান্না




জ্যাকসন হাইটসে জানাজায় সর্বস্তরের মানুষের ঢল
সাঈদ রহমান মান্নানের জন্য কমিউনিটির কান্না

সাপ্তাহিক আজকাল : 17/03/2018


আজকাল রিপোর্ট : নিউইয়র্কে বাংলাদেশিদের ‘আইকন’ হিসেবেখ্যাত বিশিষ্ট ব্যবসায়ী সাঈদ রহমান মান্নানের মৃত্যুতে কমিউনিটিতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। ‘ক্লিন ইমেজ’ এবং স্বজ্জন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত মান্নানের মৃত্যুকে কোনভাবেই মেনে নিতে পারছেন না প্রবাসী বাংলাদেশিরা। মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে সবখানে আলোচনা হচ্ছে বাংলাদেশি এ সফল নিয়ে। পরিশ্রম করে কিভাবে সফল হওয়া যায় তার জ্বলন্ত উদাহরণ হিসেবে আভির্র্ভূত হওয়ায় মান্নানকে ভুলতেই পারছেন না সব শ্রেণী ও পেশার মানুষ। মান্নান কিভাবে ব্যবসা-গড়ে তুলেছেন, কিভাবে নীরবে মানুষকে সহযোগিতা করেছেন সেই কথাই আসছে ঘুরে ফিরে।
যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের প্রবাসী কল্যাণ সম্পাদক মোহাম্মদ সোলায়মান আলী সাঈদ রহমান মান্নানের উদারতার কথা বলতে গিয়েতো আপ্লুতই হয়ে পড়লেন। তিনি সাপ্তাহিক আজকালকে বলেন, আমরা ব্রঙ্কসে একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ নিই। আমরা সিদ্ধান্ত নিই মানুষের কাছ থেকে সহযোগিতা নেয়ার জন্য। এ লক্ষে আমরা বিভিন্ন মসজিদের সামনে অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ গ্রহণ করি। এরই অংশ হিসেবে এক শুক্রবার ব্রঙ্কসের দুই ব্যক্তিকে অর্থ সংগ্রহের জন্য জুমার নামাজের পর দাঁড় করিয়ে দিই জ্যাকসন হাইটসের ৭৩ স্টিটের মসজিদের সামনে। জুমার নামাজের পর তারা কিছু লিফলেটও বিতরণ করেন।
তিনি বলেন, হঠাৎ সন্ধ্যার দিকে একটি ফোন আসে আমার কাছে। ফোনটি ছিল মান্নান ভাইয়ের। তিনি আমাকে বলেন, আপনারা কি একটি মসজিদ করছেন? উত্তরে বললাম হ্যাঁ। তাহলে একটু আমার সাথে দেখা করিয়েন। যে কথা সেই কাজ। আমি মান্নান ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করলাম। তখন তিনি জানতে চাইলেন মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করতে কত ডলার লাগবে এবং কি পরিমাণ অর্থ বাকী আছে বা কারা কি পরিমাণ অর্থ সহায়তা দিচ্ছেন? আমি তাকে বললাম জ্যামাইকার এক ভদ্র মহিলা আমাদের ৫ হাজার ডলার ‘কর্জে খাজনা’ দিয়েছেন। এখন ২০ হাজার ডলার হলে চলে। এ কথা শুনার পর মান্নান ভাই বললেন কালকে মসজিদ কমিটির সভাপতিসহ আপনি আমার বাসায় আসবেন। কথা মত আমরা গেলাম মান্নান ভাইয়ের বাসায়। তিনি আমাদেরকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ২০ হাজার ডলার ‘কর্জে খাজনা’ দিয়ে দিলেন। তিনিই আসলে মান্নান ভাই।

মান্নানের কথা বলতে গিয়ে জ্যাকসন হাইটস বাংলাদেশি বিজনেস এসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি ও সাপ্তাহিক আজকালের প্রধান সম্পাদক জাকারিয়া মাসুদ জিকো বলেন, মান্নান ভাই আসলেই বাংলাদেশিদের ‘আইকন’। বাংলাদেশিরা ব্যবসা করে প্রবাসে বিশেষ করে নিউইয়র্কে উঁচু আসনে যেতে পারেন সেটি দেখিয়ে দিয়েছেন মান্নান ভাই।
এটর্নী মঈন চৌধুরী মান্নান প্রসঙ্গে সাপ্তাহিক আজকালকে বলেন, আমরা যে কোন জায়গা মান্নান ভাইয়ের সহযোগিতা চেয়েছি তিনি করেছেন। মূলধারার ব্যক্তিদের নিয়ে অনুষ্ঠান আয়োজনের কথা শুনলে মান্নান ভাই বলতেন, আপনারা এগিয়ে যান আমি আপনাদের পাশে থাকবো।
জ্যাকসন হাইটস বাংলাদেশি বিজনেস এসোসিয়েশন (জেবিবিএ)‘র সভাপতি শাহ নেওয়াজ বলেন, মান্নান ভাই একজন সাদা মনের মানুষ। জেবিবিএ‘তে মান্নান ভাইয়ের অবদান অনস্বীকার্য। আমরা তার বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করি।
সাপ্তাহিক পরিচয় সম্পাদক নাজমুল আহসান বলেন, আমি মান্নান ভাইকে অনেক বছর ধরে চিনি। তারঁ একটি অন্যতম গুণ হল তিনি মানুষকে সম্মান দিতে জানেন। আমি নিজেদের কথাই বলি, মান্নান ভাই একমাত্র ব্যক্তি যিনি তার প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাজার করার সময় যে পরিমাণ ডিসকাউন্ট দেন ঠিক সে পরিমাণ ডিসকাউন্ট দেয়ার ব্যবস্থা করেছেন সাংবাদিকদের জন্য। ডিসকাউন্টের পরিমাণ বড় না হলেও সম্মান দেখানোটাই বড় আর সেটি মান্নান ভাই দেখিয়ে দিয়ে গেছেন।
নাজমুল আহসান আরো বলেন, মান্নান ভাই নীরবে অনেককে সহযোগিতা করতেন। তিনি হয়তো মোটা দাগে একজনকে ২০ হাজার ডলার দিয়ে সহযোগিতা করতেন না, কিন্তু ২০ হাজার ডলার ২০ জনকে দিয়ে দিতেন। এটিই ছিল মান্নান ভাইয়ের উদারতা।
আমেরিকা-বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের সভাপতি দর্পণ কবীর সাপ্তাহিক আজকালকে বলেন, আমি দু‘বছর আগে দেশে গেলে মান্নান ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হয়। সম্ভবত তিনি নিকেতনে তাঁর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলা নিয়ে কাজ করছিলেন। হঠাৎ তাঁর সঙ্গে দেখা। তিনি আমাকে একটি চাইনিজ রেস্তোঁরায় নিয়ে গেলেন। দুপুরের খাবার খেতে খেতে বললেন, আমি একটি কাজ সবসময় করি। যখন ঢাকা শহরের কোন সড়কে রিকশার চাকার হাওয়া চলে যাওয়ার পর বা রিকশা বিকল হওয়ার পর চালক টেনে টেনে রিকশা গন্তব্যে নিয়ে যাচ্ছেন সেটি দেখলেই আমি গাড়ী রাস্তার পাশে দাঁড় করিয়ে রিকশা চালককে পাঁচশ টাকা দিয়ে দিই। মনে করি রিকশাটি বিকল হওয়ায় লোকটির আজ অন্তত পাঁচশ টাকা রোজদার থেকে বঞ্চিত হলেন। মান্নান ভাইয়ের এ কথা আমাকে দারুণভাবে নাড়া দিয়েছে।
৯০ দশকে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন সাঈদ রমহান মান্নান। ছোট্ট একটি বেকারী দিয়ে ব্যবসা শুরু করেছিলেন তিনি।
১৯৯৬ সালে জ্যাকসন হাইটসের সেভেনটি থার্ড স্ট্রীট ও থার্টি সেভেন এভিনিতে গড়ে তুলেছিলেন ছোট্ট সেই বেকারী। একে একে বাড়াতে থাকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। খুব বড় পরিসওে মান্নান সুপার মার্কেট ও মান্নান গ্রোসারীর সার ২০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠান করে নিজের চোখে দেখে গেছেন সফলতা। মান্নানের সফলতার নেপথ্য কারিগর ছিলেন নিজের সহধর্মীনি। মীট কার্টার থেকে শুরু করে সব-প্রতিকূলতাই মোকাবেলা করেছেন স্বামী-স্ত্রী দু’জনে মিলে।
নিউইয়র্কে বাংলাদেশি মালিকানাধীন শীর্ষ চেইন সুপার শপে রূপ নিয়েছে মান্নান সুপার মার্কেট। ২২ বছরে মান্নানের ৭টি সুপার মার্কেটে কাজ করছেন অসংখ্য বাংলাদেশি।

মান্নানকে খুব ভালোবাসতে প্রবাসী বাংলাদেশিরা। সেটির প্রমাণ মিলেছে মঙ্গলবার তার জানাজায়। দলমত নির্বিশেষে জানায় যোগ দিয়েছিলেন প্রবাসের সর্বস্তরের মানুষ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন, নিউইয়র্কে বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল শামীম আহসান, যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সভাপতি ড. সিদ্দিকুর রহমান, মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মুকিত চৌধুরী, মুক্তিযোদ্ধা আবু জাফর মাহমুদ, এটর্নী মঈন চৌধুরী, বাংলাদেশ সোসাইটির সিনিয়র সহ সভাপতি আব্দুর রহীম হাওলাদার, সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমীন সিদ্দিকী, জ্যাকসন হাইটস বাংলাদেশি বিজনেস এসোসিয়েশেনের সাবেক সভাপতি জাকারিয়া মাসুদ জিকো, বর্তমান সভাপতি শাহ নেওয়াজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাম এসোসিয়েশন সাবেক সভাপতি তাজুল ইসলাম, জেবিবিএ নেতা হারুন ভূঁইয়া, এডভোকেট শামসুদ্দোহা, মোহাম্মদ সেলিম হারুন, ফাহাদ সোলায়মান, জবিবিএ’র সাবেক উপদেষ্টা ও নির্বাচন কমিশনার হাসানুজ্জামান হাসান, সিলেট গণদাবী পরিষদের সভাপতি আজিমুর রহমান বুরহান, জ্যামাইকা বাংলাদেশ ফ্রেন্ডস সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ফখরুল ইসলাম দেলোয়ার, কমিউনিটি নেতা আইনজীবী এন মজুমদার, আব্দুল কাদের চৌধুরী শাহীন, কাজী আশরাফ হোসেন নয়ন, খানস টিউটোরিয়াল-এর সিইও ড. ইভান খান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে বিশিষ্ট ব্যবসায়ী সাঈদ রহমান মান্নানের ইন্তেকালে কমিউনিটির সর্বস্তরের নেতৃবৃন্দ গভীর শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করেছেন। শোক প্রকাশকারীরা হলেন, বাংলাদেশ সোসাইটি ইনক’র সভাপতি কামাল আহমেদ ও সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমীন সিদ্দিকী, আমেরিকা-বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের সভাপতি দর্পণ কবীর, সাধারণ সম্পাদক শওকত ওসমান রচি, নিউইয়র্ক বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের সভাপতি ডা. ওয়াজেদ এ খান ও সাধারণ সম্পাদক শিবলী চৌধুরী কায়েস, যুক্তরাষ্ট্র যুবদলের সাধারণ সম্পাদক আবু সাঈদ আহমদ, জ্যামাইকা বাংলাদেশ ফ্রেন্ডস সোসাইটির সভাপতি শেখ হায়দার আলী ও সাধারণ সম্পাদক ইফজাল আহমেদ, মূলধারার রাজনীতিক হাসানুজ্জামান হাসান প্রমুখ।
মঙ্গলবার (১৩ মার্চ) দিবাগত ভোররাত সোয়া ২টার দিকে মান্নান নিউইয়র্কে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে দূরারোগ্য ক্যান্সারে ভুগছিলেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিলো ৬১ বছর। বুধবার (১৪ মার্চ) বাদ জোহর জ্যাকসন হাইটস মসজিদ ও তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সামনে (৭৩ স্ট্রিট) তার নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। মান্নানের মৃত্যুর খবর ফেকবুকে ভাইরাল হয়ে যায়। এতে পুরো কমিউনিটি শোকাহত হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে পার্ক ফিউনেরাল হোম-কে তার মরদেহ টেককেয়ার করার দায়িত্ব দেয়া হয়। বুধবার দুপুরে তার মরদেহ মরহুম সাঈদ রহমান মান্নানের প্রিয় ব্যবসাস্থল জ্যাকসন হাইটসের ৭৩ স্ট্রীটে নিয়ে আসা হলে সেখানে হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। বেলা সাড়ে ১২টার দিকে মরহুম মান্নানের মরদেহ ফিউনোরালের গাড়ী থেকে খাবার বাড়ীর সামনে রাখা হয়। এসময় তার স্ত্রী, কন্যা ও পুত্রদ্বয় শেষবারের মতো মুখ দেখার পর সর্বস্তরের প্রবাসী বাংলাদেশ তাকে শেষবারের মতো দেখতে ভীড় জমান। এসময় প্রবাসীদের ভীড় সমালাতে নিউইয়র্ক সিটি পুলিশকে বেগ পেতে হয়। এর আগে ৩৭ এভিনিউ থেকে ব্রডওয়ে পর্যন্ত অর্থাৎ ৭৩ স্টীট লোক ও যানবাহন চলাচলের জন্য বন্ধ করে দেয়া হয়।
পরবর্তীতে জোহরের নামাজ শেষে ৭৩ স্টীটেই নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে ইমামতি করেন হাজী ক্যাম্প মসজিদের ইমাম হাফেজ রফিকুল ইসলাম। মরহুম মান্নানের দুই পুত্র ও কনসাল জেনারেল সহ কয়েকজন শুকাংখী উপস্থিত প্রবাসীদের উদ্দেশ্যে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন। এসময় বাবাকে স্মরণ করতে গিয়ে মরহুমের দুই সন্তান কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। নিউইয়র্কের ওয়াশিংটন মেমোরিয়াল কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।



Chief Editor & Publisher: Zakaria Masud Jiko
Editor: Manzur Ahmed
37-07 74th Street, Suite: 8
Jackson Heights, NY 11372
Tel: 718-565-2100, Fax: 718-865-9130
E-mail: ajkalnews@gmail.com
� Copyright 2009 The Weekly Ajkal. All rights reserved.