বুধবার , ২১ ফেব্রুয়ারী ২0১৮, Current Time : 2:11 am




শুনি একটা, আর দেখি অন্যটা!

সাপ্তাহিক আজকাল : 16/01/2018

যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসির পাশ দিয়ে বহমান পটোমেক নদী। ওয়াশিংটনের নানা ঘটনার সাক্ষী এ নদী। যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের সুখ-দুঃখের নীরব সাক্ষী এই নদী নিয়ে রয়েছে অনেক গল্পকথা। রচিত হয়েছে অনেক কাব্যগাথা, অনেক উপাখ্যান।

পটোমেক নদীর কাছেই হোয়াইট হাউস। সেখানে থাকেন বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর মানুষটি। যাঁর নড়ন-চড়নে শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, নড়ে সারা বিশ্ব। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট কোথায় গেলেন, কী করলেন, কী বললেন, তা অনুসরণ করে তাবৎ বিশ্ব গণমাধ্যম। তো, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর বহর নিয়ে পটোমেক নদী পাড়ি দিলেন। এমনই খবর হলো যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যমে।
ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকার খবর, ‘পটোমেক পাড়ি দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প’। তাঁর খবরটি প্রথম প্রকাশের দায় যেন তাদের। সঙ্গে সঙ্গে ফক্স নিউজের সংবাদ, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প করদাতাদের অনেক অর্থ বাঁচিয়ে দিলেন। ইচ্ছে করলে জনগণের করের অর্থে তিনি পটোমেক নদী পাড়ি দিতে জাহাজ ব্যবহার করতে পারতেন।
এবার সিএনএনের পালা, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যাদের সংবাদকে প্রায়ই ‘ফেক নিউজ’ বা ভুয়া খবর বলে থাকেন। ব্রেকিং নিউজ হিসেবে সিএনএন পরিবেশন করেছে, পটোমেক নদী পাড়ি দিতে গিয়ে প্রেসিডেন্ট প্রমাণ করলেন, তিনি সাঁতার জানেন না। সিএনএন আবার সঙ্গে সঙ্গে তিনজন প্যানেল আলোচক নিয়ে প্রেসিডেন্টের সাঁতার জানা না জানা নিয়ে আলোচনা শুরু করে দিয়েছে।
বিষয়টি কৌতুক করেই বলছিলেন ট্রাম্পের ভক্ত এক রিপাবলিকান।
এ নিয়ে আমাদের সংবাদপত্রের একটি ঘটনা প্রাসঙ্গিকভাবেই মনে পড়ে যায়। নব্বই দশকের শুরুতে কোরবানির ঈদের আগের ঘটনা। দেশে তখন বহুল প্রচারিত প্রধান দুই দৈনিক পত্রিকা ইত্তেফাক আর ইনকিলাব। আজকের কাগজ তখন বাজারে নতুন ধারায় সংবাদ পরিবেশন করে বাজার মাত করছে। সাতক্ষীরা সীমান্তে ঈদুল আজহার এক বা দুই দিন আগে ষাঁড়ের গুঁতোয় একজনের মৃত্যু হয়। পরদিন আজকের কাগজ-এর সারা দেশ পাতায় সিঙ্গেল কলাম, ‘খ্যাপাটে ষাঁড়, হত এক।’ ইত্তেফাক-এর প্রথম পাতায়, ‘তাহার আর ঈদ করা হলো না’। ইনকিলাব-এর প্রথম পাতায় দুই কলাম সংবাদ, ‘ভারতীয় ষাঁড়ের গুঁতোয় এক বাংলাদেশি নিহত।’
মাঠ বদলায়, ঘাট বলায়, বদলায় না অপবাদ। যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশেও সংবাদবিভ্রমে পড়তে হয়। সপ্তাহজুড়ে মার্কিন গণমাধ্যম গরম হয়ে উঠছিল। ১১ জানুয়ারি হোয়াইট হাউসে কংগ্রেসের একটি দ্বিপক্ষীয় প্রতিনিধিদলের সঙ্গে কথা বলার সময় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মন্তব্য করেছেন, ‘হাইতি ও আফ্রিকার মতো “জঘন্য” (তাঁর ভাষায় “শিট হোল”) দেশ থেকে মানুষ আমরা কেন আমেরিকায় আসতে দিচ্ছি? আমাদের উচিত নরওয়ের মতো দেশ থেকে লোকদের আসতে দেওয়া।’ এশিয়া থেকে আরও অধিক সংখ্যায় অভিবাসী আগমনের পক্ষেও মন্তব্য করেন ট্রাম্প।
যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে ট্রাম্পের এই মন্তব্য তীব্রভাবে সমালোচিত হয়েছে। কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাট সদস্যরা এই মন্তব্যকে ‘বর্ণবাদী’ বলে প্রত্যাখ্যান করেন। কংগ্রেসের ‘ব্ল্যাক ককাস’ বা কৃষ্ণকায় সদস্যদের গ্রুপের প্রধান সেড্রিক রিচমন্ড বলেন, এখন আর কোনো সন্দেহ নেই, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যখন বলেন, ‘আমেরিকাকে আবার মহান করো’, তখন তাঁর সে কথার অর্থ দাঁড়ায়, ‘আমেরিকাকে আবার শুধু সাদাদের দেশ করো।’ মার্কিন কংগ্রেসের প্রবীণ সদস্য ফ্লোরিডা থেকে নির্বাচিত ফ্রেড্রিকা উইলসন বলেছেন, ট্রাম্পের ‘শিট হোল’ বক্তব্যের প্রতিবাদে এবারে তিনি প্রেসিডেন্টের স্টেটস অব ইউনিয়ন বক্তৃতায় অনুপস্থিত থাকবেন। কংগ্রেসওম্যান উইলসনের আগে আরও তিনজন কৃষ্ণাঙ্গ আইনপ্রণেতা জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁরা প্রেসিডেন্টের স্টেটস অব ইউনিয়ন বক্তৃতা বর্জন করবেন।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্য প্রত্যাহার ও ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানিয়েছে আফ্রিকার কয়েকটি দেশ। জাতিসংঘে আফ্রিকার দেশগুলোর রাষ্ট্রদূতেরা জরুরি বৈঠকের পর ১২ জানুয়ারি ওই দাবি জানান। হোয়াইট হাউস থেকে প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের সত্যতা স্বীকার করা হয়নি। বলা হয়েছে, ওয়াশিংটনের একদল রাজনীতিক যেখানে বিদেশিদের জন্য লড়তে প্রস্তুত, সেখানে ট্রাম্প সব সময় যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের জন্য লড়াই করছেন। এক বিবৃতিতে হোয়াইট হাউস থেকে বলা হয়, প্রেসিডেন্ট মার্কিন অভিবাসনব্যবস্থার সংস্কার চান, যার অধীনে বিদেশিদের ঢালাও আগমনের অনুমতি দেওয়ার বদলে তাঁদের গুণাবলির ভিত্তিতে আসতে দেওয়া হবে।
যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে এ নিয়ে রীতিমতো তোলপাড় শুরু হয়েছে। সাবেক ফার্স্ট লেডি হিলারি ক্লিনটন থেকে স্বঘোষিত সমাজতান্ত্রিক ডেমোক্র্যাট বার্নি সেনডার্স পর্যন্ত ট্রাম্পকে বর্ণবাদী আখ্যা দিয়েছেন। রিপাবলিকান দলের বেশ কিছু নেতাও এ নিয়ে তাঁর সমালোচনায় মুখর। যদিও তিনি ১১ জানুয়ারি দেওয়া এক টুইট বার্তায় পুরো বিষয়টি অস্বীকার করেন। এ ধরনের কোনো শব্দ তিনি ব্যবহার করেননি। ‘শিট হোল’ একটি খারাপ শব্দ। মলমূত্রের গর্ত থেকে আসা হাইতি, আফ্রিকান দেশকে তুলনা করে তিনি এমন শব্দ ব্যবহার করেননি। শব্দটি যে খারাপ, ট্রাম্প নিজেও তা বোঝেন। তাঁকে যাঁরা ভোট দিয়ে বিজয়ী করেছেন, তাঁরা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কথাই বিশ্বাস করেন।
হোয়াইট হাউসের সভায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পাশেই বসা ছিলেন জর্জিয়া থেকে নির্বাচিত সিনেটর ডেভিড পারডিউ। তিনি বলেন, ট্রাম্প খারাপ শব্দ ব্যবহার করেননি। সভায় উপস্থিত ছিলেন আরকানসাস থেকে নির্বাচিত আরেক রিপাবলিকান সিনেটর টম কটন। ১৪ জানুয়ারি সিবিএস নিউজের ফেস দ্য নেশন অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, তিনিও ট্রাম্পের মুখে এমন কিছু শোনেননি। শুনেছেন সভায় উপস্থিত ডেমোক্র্যাট সিনেটর ডিক ডুরবিন। সিনেটর ডিক ডুরবিন বেশ ভালোভাবেই শুনেছেন এবং ১৪ জানুয়ারি তাঁর মুখপাত্র দিয়ে বিষয়টি আবারও নিশ্চিত করিয়েছেন।
এখন দেখা যাচ্ছে, সভায় উপস্থিত রিপাবলিকানরা শোনেননি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মন্দ যা বলেছেন, তা শুনেছেন কেবল ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা। প্রভাবশালী পত্রিকা ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল-এ খবর বেরিয়েছে, ২০০৬ সালে স্ট্রমি ডেনিয়েল নামের ওই পর্নো তারকার সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু ওই পর্নো তারকা যাতে বিষয়টি নিয়ে মুখ না খোলেন, সে জন্য গত বছর মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মাসখানেক আগে এক আইনজীবীর মাধ্যমে তাঁকে ১ লাখ ৩০ হাজার ডলার দিয়েছিলেন ট্রাম্প। দফারফার কোনো দালিলিক প্রমাণ সংবাদে নেই। এ নিয়ে হামলে পড়েছে উদারনৈতিক হিসেবে পরিচিত মার্কিন গণমাধ্যমগুলো।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এ বিষয়টিও যথারীতি অস্বীকার করেন। হোয়াইট হাউসের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ওই ধরনের বহু খবর নির্বাচনের আগে প্রকাশিত হয়েছিল। সেসব গল্পেরই একটি আবার ছাপা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সমর্থকেরা এ কথাই বিশ্বাস করেন। তাঁরা মনে করছেন, লোকটিকে কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে না। একের পর এক বিব্রতকর আর বিরক্তিকর সংবাদ দিয়ে ব্যস্ত রাখা হচ্ছে তাঁকে। আমেরিকাকে মহান করার কাজটি ঠেকিয়ে দেওয়ার কতই না চেষ্টা করা হচ্ছে। ট্রাম্প সমর্থকেরা তাঁর পক্ষে অনড়। বলছেন, পর্নো তারকার সঙ্গে সম্পর্ক খুঁজে যাঁরা গেল গেল রব করছেন, তাঁদের মনে রাখা উচিত, খোদ হোয়াইট হাউসেই প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন কী করেছিলেন!
গত সপ্তাহান্তে ট্রাম্পের স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর হোয়াইট হাউসের চিকিৎসক রনি জ্যাকসন বলেন, ট্রাম্পের শারীরিক অবস্থা ‘চমৎকার’। এরই মধ্যে কংগ্রেসে বিল উপস্থাপন করা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মানসিক অবস্থা বিবেচনার জন্য যেন একটা কমিশন গঠন করা হয়। ‘চমৎকার স্বাস্থ্যের’ একজন লোকের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে যাঁরা প্রশ্ন উপস্থাপন করছেন, তাঁরাও হেলাফেলার লোক নন।
সোভিয়েত ইউনিয়নের চালু একটি কৌতুক এখনো অনেকের কাছে প্রিয়। সোভিয়েত ইউনিয়নে তখন মতামত প্রকাশ আর প্রচার খুবই নিয়ন্ত্রিত। এক কমরেড হাসপাতালে গিয়ে চোখ ও কানের চিকিৎসকের খোঁজ করছেন। হাসপাতালে তাঁকে সম্ভাষণ জানিয়ে বলা হলো, কোনো চিকিৎসকের সঙ্গে কাজ? কানের না চোখের। কমরেডকে পাঠানো হয় কানের চিকিৎসকের কাছে। তিনি বেঁকে বসেন। তাঁকে পরে পাঠানো হয় চোখের চিকিৎসকের কাছে। সেখানেও তিনি বেঁকে বসেন।
তিনি সঠিক চিকিৎসকের চিকিৎসা নিতে চান। কমরেড চাইছিলেন যেন একই চিকিৎসক তাঁর চোখ ও কানের অসুখ সারাবেন। কমরেডকে জানানো হয়, এমন কোনো চিকিৎসকর নেই। বিষয়টি আলাদা আলাদা। বিমর্ষ কমরেড তখন বলছিলেন, ‘আমি কেন তাহলে শুনি একটা, আর দেখি অন্যটা?’ যুক্তরাষ্ট্রেও এখন আমরা শুনছি এক, দেখছি আরেক! স্বদেশেও কি এমন অবস্থা?



Chief Editor & Publisher: Zakaria Masud Jiko
Editor: Manzur Ahmed
37-07 74th Street, Suite: 8
Jackson Heights, NY 11372
Tel: 718-565-2100, Fax: 718-865-9130
E-mail: ajkalnews@gmail.com
� Copyright 2009 The Weekly Ajkal. All rights reserved.