মঙ্গলবার , ১৬ জানুয়ারী ২0১৮, Current Time : 1:13 am




উৎপলের ফেরা এবং কিছু প্রশ্ন : শাহাব উদ্দিন সাগর

সাপ্তাহিক আজকাল : 23/12/2017

উৎপল দাস। দৈনিক ‘যায়যায়দিন’-এ আমার এক সময়ের সহকর্মী। পাশের চেয়ারে বসে কাজ করতেন। কাজ করতে গিয়ে তার সঙ্গে রয়েছে আমার বিস্তর স্মৃতি। এক সময় ঢাকার কারওয়ান বাজারের ‘বারিস্তা’ রেস্তোঁরায় নিয়মিত আড্ডা দিতাম। সৎ সংবাদকর্মী হিসেবে হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন উৎপল। সময়-অসময়ে তার ছিল নানা ধরনের জ্বালাতন। উদার হাতে টাকা-পয়সা খরচ করতেন। পায়ে ছেঁড়া স্যান্ডাল। অথচ সেই বারিস্তাতে আমাকে এবং যায়যায়দিনের ক্রাইম রিপোর্টার দেব দুলাল মিত্রকে বেশ দামি কফি খাওয়াচ্ছেন উৎপল। আমি আটলান্টিক পাড়ি দিয়েছি। উৎপল ঢাকায়। সর্বশেষ ‘পূর্বপশ্চিমবিডি নিউজ ডটকম’-এ চাকুরি নেয়ার ব্যাপারে আমিই তাকে উৎসাহ দিয়েছিলাম। ভালোই করছিলেন উৎপল। একদিন পত্রিকার পাতায় দেখলাম আমাদের সেই প্রিয় উৎপলের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছেনা। ভীষণ কষ্ট পেয়েছি। ঢাকার অনেক বন্ধুকে ফোন করেছি, উৎপলের খোঁজ-খবর জানার জন্য। ঢাকা রিপোর্টাস ইউনিটির দায়িত্বশীল অনেক সাংবাদিক বন্ধুকে বলেছি উৎপলের জন্য কিছু করতে। ঢাকার সাংবাদিকরা উৎপলের জন্য রাজপথে নেমেছেন। নিউইয়র্কেও কিছু করা দরকার এমনটা অনুভব করেছি। আমেরিকা-বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের সভাপতি দর্পণ কবীরকে নিয়ে উৎপলের জন্য সভা করেছি। আমার এসব উদ্যোগ ছিল পেশাগত উদ্যোগ। দিন যাচ্ছিল, উৎপলকে নিয়ে বাড়ছিল উদ্বেগ, বাড়ছিল ভয়। আমার প্রিয় উৎপল কি কখনো ফিরবে না? উৎপলকে কারা নিলো, সরকার চুপ কেন, মন্ত্রীরা কোন আশ্বাস দিচ্ছেন না কেন এসব প্রশ্ন প্রতিনিয়ত ঘুরপাক খাচ্ছিল। বাসা থেকে কর্মস্থল। সবখানে আলাপ করতাম উৎপলকে নিয়ে। ঢাকা থেকে উৎপলকে নিয়ে নানা খবর পাচ্ছিলাম। শঙ্কা বাড়ছিল। চোখের সামনে ভাসতো উৎপলের হাঁটা-চলা, আনমনে গান গাওয়া সবকিছুই। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যেতো। নিজেই নিজেই প্রশ্ন করতাম উৎপল জীবিত আছে তো?। না তাকে মেরে ফেলা হয়েছে?
উৎপল নিখোঁজের দিন বাড়তে থাকে। আশাও ছেড়ে দিতে থাকি। কোন কোন সময় উৎপলকে নিয়ে সাংবাদিক আন্দোলনসহ সরকারের প্রতি চাপ সৃর্ষ্টির বিষয়গুলো দারুণ নাড়া দিতো। বিশ্বাস ছিল উৎপল যদি জীবিত থাকে তাহলে তিনি ফিরে আসবেনই।
গত ১৫ ডিসেম্বর ছিল আমার ছেলের জন্মদিন। ছেলের জন্মদিনের পর খুব ফুরফুরে মেজাজে ছিলাম। অফিসে এসে খুশি মনে কাজ করছিলাম। অনলাইনে ঢাকার কাগজে চোখ বুলাতেই দেখলাম উৎপল ফিরে এসেছেন। এমনিতে মেজাজ ফুরফুরে তার মধ্যে উৎপলের ফেরার খবর দেখে মনে খুশির বান বয়ে গেলো। আমার প্রিয় উৎপল ফিরে এসেছে। গত মঙ্গলবার আমার কাছে এর চেয়ে বড় কোন খুশির খবর আর ছিলনা। নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোস্তাফিজুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, ভুলতার আধুরিয়া এলাকার শাহজালাল ফিলিং স্টেশনের সামনে থেকে উৎপলকে উদ্ধার করা হয়েছে।
উৎপলের ছবিগুলো দেখলাম। লিকলিকে উৎপল, ছোট ছোট চুল। মুখভর্তি দাঁড়ি-গোঁফ। ভয়ার্ত এবং আতংকিত চেহারা। যাই হোক। সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে আমাদের উৎপল এখন মায়ের বুকে। মায়ের কোলে শান্তির মাথা রেখেছে উৎপল। পত্রিকাগুলোতে যে খবর বেরিয়েছে তাতে উৎপলের জবানবন্দি উঠে এসেছে।
কিছু কিছু গণমাধ্যম বলছে, উৎপল একেক সময় একেক ধরনের কথা বলছে। উৎপলের বক্তব্য থেকে আমার মনে কিছু প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে।
এক. উৎপল দাস দুই মাসের অধিক সময় নিখোঁজ ছিল। রাতের আঁধারেই ফিরে এলো? উৎপলের অন্তর্ধান নিয়ে প্রশ্নের এখানেই শেষ হতে পারে না। যদি প্রশ্নের শেষ হয় তাহলে প্রশাসন ব্যর্থ। দু‘মাস ধরে নিখোঁজ হওয়া সাংবাদিক উৎপলকে প্রশাসন খুঁজে বের করতে পারেনি। এ ব্যর্থতার দায় নিয়ে উৎপল অপহরণ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাসহ দায়িত্বশীলদের পদত্যাগ করতে হবে। খুঁজে বের করতে হবে প্রকৃত ঘটনা।
দ্ইু. বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদকে পাওয়া গিয়েছিল ভারতীয় সীমান্তে। কে বা কারা তাকে সেখানে নামিয়ে দিয়েছিল তার উত্তর মেলেনি এখনও।
তিন. সম্প্রতি লেখক এবং কবি ফরহাদ মজহারকেও অপহরণ করে নিয়ে খুলনা নিউ মার্কেট এলাকায় নামিয়ে দেয়া হয়েছিল। উৎপল, সালাহউদ্দিন আহমদ, ফরহাদ মজহারকে ফিরে আসার ঘটনার বিবরণ একই ধরনের। তাহলে প্রশ্ন জাগে, একই ধরনের ঘটনা কারা ঘটাতে পারে? একই ধরনের গল্প কারা তৈরি করতে পারে?।
চার. উৎপল ফিরে আসার পর একেক সময় একেক ধরনের কথা বলছে। এটার কারণ কি? উৎপল নির্ভয়ে কিছু বলতে পারছেন না কেন? কারা তারা মুখে কুলুপ এঁটে দিয়েছেন?
পাঁচ. সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে ইতোপূর্বে উৎপলকে নিয়ে নানা বক্তব্য দেয়া হয়েছে। উদ্ধার হওয়ার পর কর্তাব্যক্তিদের বক্তব্য বন্ধ কেন?
ছয়. উৎপল দাস নিখোঁজের আগে ফেইসবুকে নানা স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন। এটাই কি তার জন্য কাল হয়েছিল। উৎপলকে ভিকটিম বানিয়ে অন্য সাংবাদিকদের কি একটি গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে বার্তা দেয়া হয়েছে? এখন সব খোলামেলা করতে হবে।
সাত. ২০১৪ সালের এপ্রিলে পরিবেশবাদী সংগঠন ‘বেলা’র নির্বাহী পরিচালক এডভোকেট সৈয়দা রেজওয়ানা হাসানের স্বামী আবু বক্কর সিদ্দিকীকে অপহরন করা হয়েছিল। তিনিও উদ্ধার পেয়েছিলেন। তাঁর উদ্ধারের গল্প উৎপলের গল্পের মতোই। প্রশ্ন দেখা দেয়, তাহলে গল্পগুলো বানায় কারা, এর রূপকার কারা? আবু বক্কর, সালহউদ্দিন, ফরহাদ মজহারকে উদ্ধার বা খুঁজে পাওয়ার গল্প একই রকম কেন?
আট. উৎপল উদ্ধার হয়েছে, বা ফিরে এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোবাশ্বের সিজার ফিরবেন কখন? সাবেক কূটনীতিক মারুফ জামান ফিরবেন কখন? আমরা এসব নিখোঁজ ব্যক্তিদের দ্রুত ফিরে পেতে চাই। নিখোঁজ/ অপহরণ/ গুমের গল্প যাই হোক না কেন আমরা তাদের জীবিত ফিরে পেতে চাই।
নয়. বাংলাদেশে সরকার বিরোধী অনেকেই নিখোঁজ হচ্ছেন, গুম হচ্ছেন এমন খবর সচরাচরই কানে আসছে। তারা কেন উদ্ধার হচ্ছে না?
দশ. রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিককে নিরাপত্তা দেয়ার দায়িত্ব সরকারের। উৎপলরা নিখোঁজ হয়। তাদের নিরাপত্তা দিতে পারে না সরকার। দুই মাসেও প্রশাসন উৎপলকে উদ্ধার করতে পারে না। তাহলে কি বলতে পারি না নাগরিকদের নিরাপত্তা দিতে সরকার ব্যর্থ! হ্যাঁ তাই।
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, আজকাল, নিউইয়র্ক



Chief Editor & Publisher: Zakaria Masud Jiko
Editor: Manzur Ahmed
37-07 74th Street, Suite: 8
Jackson Heights, NY 11372
Tel: 718-565-2100, Fax: 718-865-9130
E-mail: ajkalnews@gmail.com
� Copyright 2009 The Weekly Ajkal. All rights reserved.