সোমবার , ১৮ ডিসেম্বর ২0১৭, Current Time : 12:15 am




রমনার কালীবাড়ী ও আনন্দময়ী আশ্রম যেমন ছিল তেমন চাই

সাপ্তাহিক আজকাল : 30/09/2017

রবীন্দ্র সরকার –
শরৎ এলো, সোনালী অরুণ আলোয় আঁচল ছড়ালো অসীম নীল আকাশে। সাদা মেঘের ভেলা উড়ে যায় অন্য দেশে। শুভ্র হাসির আনন্দে ঢেউ খেলে যায় কাশের বনে, শিশির¯œাত ঘাসের বুকে কে যেন একে দিল শেফালীর আলপনা। আকাশে বাতাসে পল্লবে নদীতে সর্বত্র এক খুশীর ঝলকানি। চারিদিকে আনন্দবার্তা-শরৎ এসেছে। সবাই মা আনন্দময়ীর আগমনের প্রতীক্ষায়। ঘরে ঘরে মহিষাসুর মর্দিনী প্রভাতী অনুষ্ঠান। পূজা মন্ডপ থেকে ভেসে আসছে ঢাকের আওয়াজ, ধূপের গন্ধ। শরতের শুরুটাই এমন মহিমান্বিত যেন মনে হচ্ছে এমন আনন্দ খুশী বাংলার বুকে চির অম্লান। মুসলমান ভাইদের পবিত্র কোরবানী ঈদের খুশীর আমেজ থাকতে থাকতেই চলে এল আনন্দময়ী মা দুর্গার আগমন। এ আনন্দ থাকেব ১০দিন। বাংলাদেশেও এই আনন্দ চলবে ১০দিন।
বাংলাদেশের হিন্দুদের এই মহাআনন্দের মাঝেও লুকিয়ে থাকে শঙ্কা। নিরাপত্তার জন্য তাদের সব সময় সজাগ থাকতে হয়। বাংলাদেশে পূজার সময় সরকার কঠোর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে থাকে। এই কঠোর নিরাপত্তা থাকা সত্ত্বেও বিগত শারদীয় দুর্গা পূজায় কোন কোন এলাকায় পূজা পন্ড হয়েছে। অনেক বাধা বিঘœ অতিক্রম করেই পুজা করতে হয়েছে। কারণ বিগত কয়েক বছর রোজার মাস থাকার জন্য পূজার সময় ঢাক বাজাতে দেওয়া হয় নাই, ঘন্টা বাজাতে দেওয়া হয় নাই, উলু ধ্বনি দিতে দেওয়া হয় নাই। এই ছিল বিগত কয়েক বছরের পূজার দৃশ্য। স্বাধীন দেশের প্রজা হয়ে যদি পূজামন্ডপ পুলিশ, বিডিআর দিয়ে ঘেরাও করে পূজা করতে হয় সেখানে আনন্দ ফুর্তির স্বাধীনতা কোথায় থাকে? প্রশ্ন আসে সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় কাজ করতে এত কঠোর নিরাপত্তা থাকবে কেন? এতেই বুঝা যায় বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় স্বাধীনতা বলতে কিছু নাই। এবারও সরকার দুর্গাপূজা উপলক্ষে কঠোর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছে। ঐ কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে সংখ্যালঘুরা যতটুকু পূজার আনন্দ উপভোগ করা যায় তাই করবে। অথচ একই দেশে ঈদের আনন্দ মুক্ত স্বাধীন ভাবে উপভোগ হয়ে থাকে। সেখানে থাকে না কঠোর নিরাপত্তা। শুধু সংখ্যালঘুদের বেলায় নিরাপত্তার দরকার হয়। আগে তো এমন অবস্থা ছিল না।
পূজার সময় মুসলমান ভাইয়েরা এসে আনন্দে যোগ দিত, সহযোগিতা করত। কোন অঘটন ঘটত না। আর এখন প্রতি বছর কোন কোন স্থানে পূজা করতেই দেওয়া হচ্ছে না। সংখ্যালঘুদেরকে হুমকি দিয়ে পূজা না করার জন্য ভয়ভীতি দেখানো হয়। এর কারণ বাংলাদেশে ইসলামী মৌলবাদের উদ্ভব ঘটেছে। এই ইসলামী মৌলবাদীরা চায় না দেশে অন্য ধর্মের চর্চা হোক। অন্য ধর্মের লোকদের এরা কাফের বলে মনে করে। পূজা পার্বনকে গুনাহ মনে করে। তাই পূজা ও সংখ্যালঘুদের অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠান তারা করতে দিতে চায় না। বাংলাদেশে যত শক্তিশালী সরকারই গদিতে থাকুক যতদিন না বাংলাদেশ থেকে মৌলবাদ নির্মুল না হবে ততদিন বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের যে কোন ধর্মীয় অনুষ্ঠান কঠোর নিরাপত্তা মধ্যেই করতে হবে। অতএব বর্তমান সরকারের উচিৎ পুজায় এত নিরাপত্তার কথা চিন্তা না করে বাংলাদেশ থেকে মৌলবাদীদের চিরতরে নির্মুল করার কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। মৌলবাদ মুক্ত বাংলাদেশ হলেই সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে কঠোর নিরাপত্তার প্রয়োজন হবে না।
বর্তমান সরকার সংখ্যালঘুদের জন্য কি চিন্তা ভাবনা করছে জানিনা। তবে শারদীয় দুর্গোৎসবে মায়ের আগমনের সময়ে সরকারকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, বাংলাদেশে বিগত সরকারগুলি যে মহা ভুলট করেছে সেই ভুলটা যেন তারা না করে। যদি ভুল করে তবে এ সরকারকেও বিগত সরকারগুলির মত ফল ভোগ করতে হবে। ভুলটা হল ঢাকায় মা আনন্দময়ী আশ্রম ও রমনার কালীবাড়ী পুনঃপ্রতিষ্ঠিত না করা। বিগত কোন সরকারই এ কাজটি করে নাই। যার ফলে মায়ের কুদৃষ্টিতে সব সরকারকে এর পরিনাম ভোগ করতে হয়েছে। প্রতি বছর শরৎ আসে মা আনন্দমীয়র আগমনও ঘটে। কিন্তু বহু শতাব্দী পূর্বে গড়ে ওঠা মায়ের যে আশ্রয়স্থল রমনা-কালীবাড়ী ও আনন্দময়ী আশ্রম ঢাকার কেন্দ্রবিন্দুতে গগনচুম্বি হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল সেই মন্দির অবহেলা করে বঙ্গবন্ধুর শাসন আমলেই বুলডোজার দিয়ে ভেঙে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়ে জাগ্রত মাকে আশ্রয়হীন করে দেয়া হয়েছিল। আজ পর্যন্ত ঐ মন্দির পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হল না। আজ বাংলাদেশের এমন অবস্থা কেন? বিয়াল্লিশ বছরেও বাংলাদেশ উন্নতির মুখ কতটুকু দেখেছে? কেন দেশ দুর্নীতিতে ছেয়ে গেছে? প্রতি বছর বন্যার করাল গ্রাসে দেশের মানুষ কেন হাহাকার করে? এটা কেন হচ্ছে কেউ তলিয়ে দেখছে না। এটা করালবদনী মা আনন্দময়ীর অভিশাপ। যখন থেকে রমনার কালীবাড়ী ও আনন্দময়ী আশ্রম গুড়িয়ে দিয়ে সেখানে পার্ক করা হয়েছে সেই দিন থেকে মায়ের অভিশাপে বাংলাদেশ নুয়ে পড়েছে। শত চেষ্টা করেও বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারছে না। এই অভিশাপ থেকে মুক্তির জন্য বর্তমান সরকারের কাছে আমার দাবী, সব কিছু করার আগে রমনা কালীবাড়ী ও আনন্দময়ী আশ্রম যেখানে যেমনভাবে ছিল ঠিক সেইখানে তেমনভাবেই গড়ে দিয়ে মায়ের প্রাণ প্রতিষ্ঠা করুন। দেখবেন বাংলাদেশ রাহুমুক্ত হয়ে চিরশান্তির দেশ হয়ে উঠবে এবং সমস্ত বাধা অতিক্রম করে পৃথিবীর বুকে মাথা উঁ”ু করে দাঁড়াবে। যতদিন পর্যন্ত রমনা কালীবাড়ী ও আনন্দময়ী আশ্রম একই জায়গায় গড়ে না দেওয়া হবে ততদিন পর্যন্ত বাংলার শান্তি আসবে না। রাহুমুক্তি হবে না। শান্তি আসতে পারে না। এটা আমার কথা নয়, মায়ের কথা।
পরিশেষে দুর্গাতিনাশিনী মায়ের কাছে প্রার্থনা জানাই, বাংলাদেশ যেন সন্ত্রাসমুক্ত দুর্নীতিমুক্ত ও সংখ্যালঘু নির্যাতনমুক্ত হয়ে চিরশান্তির দেশ হয়ে ওঠে।
‘যা দেবী সর্বভূতেষু শান্তি রূপেন সংস্থিতা, নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ’।
লেখক: কলামিস্ট, নিউইয়র্ক।



Chief Editor & Publisher: Zakaria Masud Jiko
Editor: Manzur Ahmed
37-07 74th Street, Suite: 8
Jackson Heights, NY 11372
Tel: 718-565-2100, Fax: 718-865-9130
E-mail: ajkalnews@gmail.com
� Copyright 2009 The Weekly Ajkal. All rights reserved.