সোমবার , ১৮ ডিসেম্বর ২0১৭, Current Time : 12:15 am




আসুন আমরা বাংলাদেশকে সার্বজনীন করি

সাপ্তাহিক আজকাল : 30/09/2017

শিতাংশু গুহ –
শুরুতেই সবাইকে দুর্গাপূজার শুভেচ্ছা জানিয়ে রাখি। দুর্গাপূজা আসলে সুর এবং অসুরের মধ্যে লড়াই। সুর অর্থ সুন্দর এবং অসুর অর্থ অসুন্দর। যাহা সুন্দর তাহা সত্য। সত্য সর্বদা বিজয়ী হয়। দেবী দূর্গা ও মহিষাসুরের মধ্যেকার এই যুদ্ধে অসুর পরাজিত হয়। দেবী অর্থাৎ সুর বা সুন্দর বিজয়ী হয়। এটিকে মানুষের মনের মধ্যে ন্যায়-অন্যায় বা সমাজের ভাল-মন্দ বা একটি দেশের শুভ-অশুভ হিসাবে বিবেচনা করা যায়। সবাই শুভশক্তির বিজয় কামনা করে। দেবীদুর্গা শুভ শক্তির প্রতীক। মা যেমন সর্বদা সন্তানের মঙ্গল কামনায় ব্যস্ত, জগৎজননী মা-দুর্গা তেমনি জীবের মঙ্গলে অসুরের সাথে যুদ্ধ করেন। জগতের কল্যাণে ধরাধামে তিনি বারবার আবির্ভূত হন।
দেবী দুর্গা বাংলাদেশের হিন্দুদের অসুর বিনাশের শক্তি দিন। বাংলাদেশে এবার প্রায় ত্রিশ হাজার পূজা হচ্ছে। সরকার পূজার সময় যথেষ্ট নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেন, এজন্যে সরকারকে ধন্যবাদ। প্রশ্ন হলো, পূজার সময় নিরাপত্তা লাগে কেন? আগে তো লাগতো না? বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালে দেশে ফিরে বলেছিলেন, এখন থেকে যে যার ধর্ম পালন করবেন, কেউ কারো উপর ধর্মের নামে জোর-জবরদস্তি করতে পারবেনা। এজন্যেই তিনি সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা সংযোজন করেছিলেন। ধর্মনিরপেক্ষতা মানে রাষ্ট্র কোন ধর্মকে প্রাধান্য দেবে না। বাংলাদেশে একটি ধর্মকে প্রশ্রয় দেয়াটা এখন শুধু স্পষ্ট নয়, বরং দৃষ্টিকটু। অথচ মুখে ধর্মনিরপেক্ষতার খই ফোটাতে আমরা ওস্তাদ। এজন্যেই হয়তো ইমরান এইচ সরকার বলেছিলেন, মুখে মুক্তিযুদ্ধের খই ফুটাবেন, আর মুর্তি ভাঙবেন তা তো হয়না! দেশে এখন বঙ্গবন্ধু নেই, ধর্মনিরপেক্ষতাও নেই।
বাংলাদেশে পূজার সময় প্রচুর মুর্র্তি ভাংার ঘটনা ঘটে। এটা দীর্ঘদিন ধরেই চলছে, বাহাত্তরেও ভেঙেছে, ২০১৭-তেও ভাঙছে। বাংলাদেশের ৪৬ বছরের ইতিহাসে হাজার হাজার মুর্ক্তি, মন্দির ভাঙলেও আজ অবধি একজনও এই অপরাধে শাস্তি পেয়েছে, এমন নজির নেই। এবার মানিকগঞ্জের সিঙ্গইরে দু’টি মন্দিরের ১৫টি মুর্তি ভাঙচুর করেছে দুর্বৃত্তরা। সাতক্ষীরার আশাশুনীতে ৫টি প্রতিমা ভাঙচুর হয়েছে। লালমনিরহাটে মন্দিরের জমি দখলের অভিযোগে ১৮টি মন্দিরে দুর্গাপূজা হচ্ছেনা। দিনাজপুরের বীরগঞ্জে মহালয়ার দিন দূর্গা প্রতিমা ভেঙেছে দুর্বৃত্তরা। চট্টগ্রামের পাথরঘাটা এলাকায় পাঁচবাড়ী পূজা মন্ডপে এবার ব্যতিক্রমী একটি দেবীমুর্তি গড়া হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে হিন্দুদের ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদ হিসাবে সংবাদপত্রে প্রকাশিত নির্যাতনের বিভিন্ন সংবাদের কাটিং দিয়ে দেবীমুর্তির পোশাক বানানো হয়েছে এবং ব্যাকগ্রাউন্ড সাজানো হয়েছে। মুর্তির হাতে একটি কাটা মুন্ডু এবং অন্যহাত খুঁটিতে বাঁধা দেখানো হয়েছে। কমিটির নেতারা বলেছেন, প্রতিবাদ হিসাবেই এটা করা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম নাকি হিন্দুদের একটি মন্ডপে পূজা করার নির্দেশ দিয়েছেন? আগে সেখানে চারটি মন্ডপে পূজা হতো। এবার ইউপি চেয়ারম্যানের নির্দেশ, একটি পূজা। হুকুম না মানলে ‘মালাউনদের মেরে সাইজ করে দেয়ার’ হুমকি দিয়েছেন তিনি। ক’বছর আগের প্রতিবাদী ‘ঘটপূজার’ কথা তো আমরা সবাই জানি।
‘যখন দূর্গা আসেন, অসুরও সাথে আসে’। দূর্গা দেবী ক’দিন বাদে চলে যান, কিন্তু অসুররা থেকে যায়। যারা মুর্তি ভাঙে তাদের কি অসুর বলা যায়? আসলে যা অসুন্দর তাই অসুর? দুর্গাপূজায় হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ হয়। এবার কেউ কেউ ঘোষণা দিয়েছেন যে তারা এই খরচের কিছুটা দেশের বন্যার্তদের এবং শরণার্থীদের মধ্যে বিতরণ করবেন। এটি নি:সন্দেহে ভালো উদ্যোগ। মানবতার কল্যাণে দেবীদুর্গার আগমন, তাই দুর্গতের সাহায্যে এগিয়ে যেতে তো হবেই। এবার দুর্গাপূজা উপলক্ষে আরো একটি আহ্বান এসেছে যে, নিউইয়র্ক, বাংলাদেশ ও বিশ্বের প্রতিটি মন্দির ও পূজা কমিটিগুলো অনুগ্রহ করে যদি প্রতিবছর বাংলাদেশে একটি হিন্দু পরিবারকে প্রতিষ্ঠিত করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন তাহলে কি খুব ভালো হয়না? এমন মহতী সিদ্ধান্ত শুধু যে হিন্দুদের উপকারে লাগবে তা নয়, বরং এতে সমাজ ও দেশের উপকার হবে। নিউইয়র্কে প্রতিটি পূজায় খরচ ২৫ থেকে ৬০ হাজার ডলার। মাত্র ১হাজার ডলার বাঁচিয়ে দেশে একটি পরিবারকে প্রতিষ্ঠিত করে দিলে পূজার আনন্দ নিশ্চয় বেড়ে যাবে।
দুর্গাপূজা সর্বজনীন। অর্থাৎ সবার। সবাই মিলেই এটিকে সার্থক করতে হয়। সবাই মিলিত হওয়া তখনই সম্ভব যখন সবার মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ থাকে। ‘আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম’-গানটি আমরা প্রায়শ গাইতে পছন্দ করি। কিন্তু আগের দিনগুলো ফিরিয়ে আনতে আমাদের কোন প্রচেষ্টা নেই। মানুষে মানুষে আগের মত সংযোগ নেই? পরিবারের সংজ্ঞা পাল্টে যাচ্ছে। উৎসবগুলো হয়ে যাচ্ছে সম্প্রদায়ভিত্তিক। ১৯৯০ সালে বাংলাদেশের মানুষ যখন নিউইয়র্কে ‘বাংলাদেশ পূজা সমিতি’-র ব্যানারে দুর্গাপূজা শুরু করে, তখন পূজাটা হিন্দুদের থাকলেও উৎসবে সবাই জড়িত ছিলো। পূজায় মুসলমানদের উপস্থিতি ছিলো উৎসাহব্যঞ্জক। এখন নিউইয়র্কে অনেকগুলো পূজা হয়, লোক সমাগম প্রচুর। কিন্তু সংখ্যাগুরুর উপস্থিতি কমে গেছে। এর কারণ কি? তবে গতবার জ্যাকসন হাইটসে পূজা হয়েছিল, তাতে আমি জড়িত ছিলাম, সেই পূজায় সংখ্যাগুরুর উপস্থিতি ছিলো লক্ষ্যণীয় এবং স্থানীয় বাঙালী ব্যবসায়ীরা তাতে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। এবার পূজাটি আর জ্যাকসন হাইটসে হচ্ছে না। অন্যত্র সরে গেছে।
দেবীদুর্গা এবার নৌকায় এসেছেন। অর্থাৎ এবার ফলন ভালো হবে। আসলেই এবার বাম্পার ফলন দরকার। কারণ, বন্যার কারণে দেশে খাদ্যের মজুদ কমে গেছে। আমাদের বার্মা থাকে চাল কিনতে হচ্ছে। তদুপরি অতিরিক্ত কয়েক লক্ষ শরণার্থীকে খাওয়াতে হচ্ছে। দেবী দুর্গা বাংলাদেশকে রক্ষা করুন। অত্যাচারের হাত থেকে সংখ্যালঘুদের বাঁচান। তবে কানাডা থেকে শেখ শামসুন্নাহার ইতি লিখেছেন, ‘পড়শীর জন্যে কেঁদে বুক ভাসাই, পূজা মন্ডপ ভেঙে বাপ-দাদার ভিটামাটি থেকে তাড়াই’ আমাদের এ ধরনের কার্যকলাপ থেকে সরে আসা দরকার। আর কত? শরণার্থীরা জানান দিচ্ছে, কেউ স্বেচ্ছায় দেশ ছাড়ে না, ছাড়তে বাধ্য হয়। যার বাড়িতে আগে দুর্গা পূজা হতো, এখন তা কেন হয়না, তা কি কেউ জিজ্ঞাসা করে? হিন্দুরা কেন দেশ ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে তা জানার চেষ্টা করুন এবং তা ঠেকান। নইলে সৈয়দ আশরাফের কথাই না সত্য হয়ে যায়, ‘হিন্দুরা ভালো না থাকলে আপনারাও ভালো থাকবেন না।’
দেশটি আমার। দুর্গা দেবী আমার। আসুন, আমরা দেশটিকে সার্বজনীন করি। ধর্ম যার যার, দেশ সবার।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, নিউইয়র্ক।



Chief Editor & Publisher: Zakaria Masud Jiko
Editor: Manzur Ahmed
37-07 74th Street, Suite: 8
Jackson Heights, NY 11372
Tel: 718-565-2100, Fax: 718-865-9130
E-mail: ajkalnews@gmail.com
� Copyright 2009 The Weekly Ajkal. All rights reserved.