সোমবার , ১৮ ডিসেম্বর ২0১৭, Current Time : 12:14 am




পূজার অনুষ্ঠান এবং একজন ‘জাতীয় অসুর’

সাপ্তাহিক আজকাল : 30/09/2017

জীবন চৌধুরী –
বাংলাদেশ টেলিভিশনে দুর্গা পূজা ও জন্মাষ্টামী মিলে অনেক অনুষ্ঠানের লেখক-নির্দেশক হিসেবে কাজ করার সুযোগ হয়েছে আমার। গীত রচয়িতা হিসেবেও অংশ নিতে হয়েছে কয়েকটি অনুষ্ঠানে। এ ধরনের অনুষ্ঠানের পান্ডুলিপিকারদের মধ্যে মদন শাহু, কালীপদ দাস (কে পি দাস), অধ্যাপক নিরঞ্জন অধিকারী, শ্যামল দত্ত, বিদ্যুৎ কর প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য। বেতার টেলিভিশনের সুরকারদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন সুধীন দাশ, সুখেন্দু চক্রবর্তী, দেবু ভট্টাচার্য, অজিত রায়, সাধন চন্দ্র বর্মন, সুবল দত্ত, প্রণব দাস, সুজেয় শ্যাম, পান্না দাস, রবীন্দ্রনাথ সরকার প্রমুখ। বাংলাদেশ টেলিভিশনে পূজার অনুষ্ঠান প্রযোজনা করেছেন বদরুন্নেসা আব্দুল্লাহ, রিয়াজউদ্দিন বাদশা, জিয়া আনসারী, আলাউদ্দিন আহমেদ, আলী ইমাম, কাজী আবু জাফর সিদ্দিকী, মুসা আহমেদ, আলিমুজ্জামান দুলু, নূর হোসেন দিলু, রেজাউল করিম, ফখরুল আবেদীন দুলাল, মঞ্জুরুর রহমান, সিরাজুল ইসলাম, মো: সারওয়ার, আজিজুল হক, মোস্তাফিজুর রহমান, বদরুজ্জামান, মনোজ সেনগুপ্ত ও আরো অনেকে।
পারফর্মারদের মধ্যে প্রথমেই আসে মহিষাসুরের নাম। বেতার-টিভি উভয় মাধ্যমে অমল বোসকে অতিক্রম করার মতো ‘মহিষাসুর’ কেউ আসেনি। তবে রতন সাহা সাধ্যমতো চেষ্টা করেছেন ‘মহিষাসুর’ এর মতো কেন্দ্রীয় চরিত্র ফুটিয়ে তুলতে। সে রকম সম্ভাবনা এবং প্রতিভাও আছে তার। অমল বোস মহিষাসুর চরিত্রে যে আসুরিক শক্তি নিয়ে আবির্ভুত হয়েছেন তা যেমনি বিস্ময়কর তেমনি তার কৃতিত্বের উজ্জ্বল স্বাক্ষর বহন করে। ফলে তিনি সেই চরিত্রে এমনই ইমেজ সৃষ্টি করেছেন যার জন্যে বীরউত্তম সি আর দত্ত (মেজর জেনারেল অব:) এক সময় কৌতুকচ্ছলে বলেছিলেন, জীবন, পূজার অনুষ্ঠানে জাতীয় অসুরটা আছে তো? আসলে অমল বোস হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেকের কাছে অঘোষিত জাতীয় অসুর হিসাবে খ্যাত। পরে কয়েক বছর ধরে তিনি ইত্যাদি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানে ‘নানা-নাতী’ পর্বে নানা হিসেবে সমধিক প্রশংসিত হতে পেরেছেন সর্বমহলে। তবে অনেকেরই ধারণা যে, অমল বোসের উত্তরণ ্ওই ‘মহিষাসুর’ দিয়েই। তবে তিনি ফিল্মে অত্যধিক ব্যস্ততার কারণ উল্লেখ করে মহিষাসুর কিংবা কংস চরিত্রে অভিনয় করার অফার উপেক্ষা করতেন। এর পেছনে কী কারণ ছিল জানি না। তবে বাস্তবতা হলো, তখনও পর্যন্ত মানুষ অমল বোসকে মহিষাসুর ও কংস চরিত্রে দেখতে চাইত।
মহিষাসুর চরিত্রে তাঁকে স্বর্গের সিংহাসনে উপবিষ্ট দেখেছি হাস্যোজ্জ্বল বদনে: কী আনন্দ আজি দানবের, স্বর্গ দখল করি দেবগণে দিয়াছি তাড়ায়ে, যাযাবর সম ধরায় তারা পালিয়ে বেড়ায়। আবার রণাঙ্গনে দেব কর্তৃক অসহায় অসুরের নির্মম পরাজয়ের গ্লানিতে বিষন্ন বেদনায় মর্মাহত হয়ে তিনি উচ্চারণ করতেন, বিনা মেঘে বজ্রপাত সম পশিল এই দুঃসংবাদ মোর কর্ণকুহরে– না না, এ যে অসহ্য, এবার নিজ হস্তে নিতে হবে যুদ্ধের ভার, দেখা যাবে কত শক্তি ওই দুর্মতি দুর্গার ..।
মেকআপ রুমে ভয়াল ভীষণ আকৃতির মহিষাসুরের মেকআপ নিচ্ছেন অমল বোস। মেঘাচ্ছন্ন আকাশের মতো কেশদাম। দু’চোখ যেন রক্ত জবা। দানবীয় মুখ। শিল্পী-কলাকুশলীদের ভিড়। এ সময়ে সঙ্গীতশিল্পী সুবীর নন্দী তার শিশু কন্যা মৌকে নিয়ে ঢুকলেন। সুবীরের মেয়ে মহিষাসুর বেশে অমল বোসকে দেখামাত্রই সে কী চিৎকার। ভয়ে জড়সড়। এক পর্যায়ে ও দৌড় দিলো। পলকেই বেরিয়ে গেল মেকআপ রুম থেকে একেবারে টিভি ভবনের মেইন গেটের সামনে। অনেক কষ্টে তাকে ধরা গেলো। নয়তো সেদিন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে হয়তোবা রাস্তা ধরেই হাঁটতে থাকতো। অল্পের জন্যে রক্ষা পেলো মৌ। ও বারবার সুবীরকে বলছিল, চল বাবা বাড়ি যাই। আমি আর কোনদিন অসুর দেখব না। অথচ পূজার মহড়া কক্ষে ধবধবে সাদা পাঞ্জাবী-পাজামা পরিহিত অমল বোস বেশ ধীর শান্ত। হাতে ছোট্ট ব্যাগ থেকে স্ক্রীপ্ট বের করেই বলেন, এইবার শুরু কইরা দেন। রিহার্সেল শুরু হলো। অমনি চেহারা গেল পাল্টে। শান্ত মুখ অশান্ত। তার দু’পাশে সেনাপতি আর সাঙ্গপাঙ্গ। এক পর্যায়ে ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলেন অমল বোস। একজনের কলার এমনভাবে চেপে ধরলেন যে তার শার্টের সব কটা বোতাম গেল ছিঁড়ে। মূলত অমল বোসের অসুর কূলের এমন কম লোকই ছিলেন যারা বোতাম অক্ষুন্ন রেখে বাড়ি ফিরতে পারতেন। বলতেন, রিহার্সেলে যদি আবেগ না থাকে তবে ভিটিআর-এর দিন বেগ থাকবে কেন? তাই আমি সবাইকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যার যে চরিত্র সে মতোই অভিনয় করো, দেবতারা দেবতাদের মতো, দানবরা দানবসুলভ।
একদিন রিহার্সেল দেখতে এসেছিলেন শিল্পী কিরণ চন্দ্র রায়। বললাম কিরণ, তুমি বিবেকের যে গানটা অজিত রায়ের সুরে ‘শোনরে অসুর রাজন, শক্তির জোরে যায়না করা দেবতা শাসন’ গাইবে সেটা অমলদার (মহিষাসুর) সামনাসামনি গাইতে হবে তোমাকে। কিরণ নিরুত্তর। আসলে মহিষাসুর রূপী অমল বোসের সামনাসামনি হয়ে গান গাইতে কিরণের ভয় ঢুকেছিল মনে। মনের গোপন কথা এক পর্যায়ে বেরিয়ে এলো, অমলদা রাগ হয়ে যদি চড়-থাপ্পর মাইরা বসে তাহলে? রিহার্সেলে যেভাবে দেখলাম তাতে ভয় না পাইয়া যাই কই? যাই হোক শেষ পর্যন্ত কিরণকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে রাজি করলাম ঠিকই, কিন্তু ভিটিআর-এর সময় যদ্দুর সম্ভব ‘মহিষাসুর’ অমলদার সঙ্গে দুরত্ব বজায় রেখেই কিরণ গানের পাট সম্পন্ন করতে পেরেছিল। তব্ওু সব সময় তার চোখে মুখে ভয়ের ছাপ ছিলো স্পষ্ট। আরেকবার হলো কি-ভিটিআর চলছে, প্যানেলে আবু জাফর সিদ্দিকী, টেনশনের মানুষ। আমি পাশে বসা। টেক হবে মহিষাসুর বধ দৃশ্য। জাফর সিদ্দিকী কিউ দিলেন, কিন্তু না অমল বোসকে দেখা যাচ্ছে না মনিটরে। শুধু দুর্গা (মিতা ব্যানাজী) দাঁড়িয়ে। জাফর সিদ্দিকীর চিৎকার এই অমল, কথা বলছো না কেন? খুব ক্ষীণ স্বরে অমল বোস- ক্যাম্নে কথা কই, দুর্গাতো পাহাড়ের উপরে, হের শাড়ি নিচে ঝুইল্যা পড়ছে, আমিতো ফাঁকে আইটকা গেছি। বাইর অইতে পারলে না ডায়ালগ কইতে পারি। এ সময় মিতা বলছে: অমল দা, তুই বাইর হইবি কিনা ক’ না হইলে আমি কিন্তু ..এই বার বুঝসতো? প্যানেল থেকে বাস্তব অবস্থাটা বুঝলাম। অবশেষে অসহায় অমল বোসকে উদ্ধার করা হলো। জাফর সিদ্দিকী বললেন, তোমরা এখন রেষ্ট নাও, এই ফাঁকে আমি অন্য দৃশ্য টেক করি।
অমল বোস ভীষন মুডি আর্টিষ্ট ছিলেন তবে পাঠ মুখস্ত করাটা শেষ দিকে তার জন্য কিছুটা কষ্টকর হতো। ফলে মুখে যা আসতো তাই বলে দিতেন। একবার লেখক বাধা দিলেন। আর অমনি অমল বোস মহিষাসুরের ড্রেস নিয়ে হঠাৎ উধাও হয়ে গেলেন। শুধু বললেন, দিলো তো আমার মুড ছেড়াবেড়া কইরা। টেক করার সময় বাধা দিলে আমার খুব রাগ পায়, কেন সেকেন্ড টেক্ওতো নেয়া যেত, ফাষ্ট টেক ওকে না হইলে? নীতি ও আদর্শবান মানুষ অমল বোস। তিনি পূজার অনুষ্ঠানকে অত্যন্ত পবিত্র জ্ঞান করতেন। একবার তার কানে গেল অনুষ্ঠান সম্পর্কে বিরূপ কথাবার্তা। ফলে তিনি আর ওই বছর অভিনয়ই করলেন না।
প্রসঙ্গত বলতে হয়, বাংলাদেশ টেলিভিশন অনুষ্ঠানের আগেই অমল বোসকে বেতারে পেয়েছি। মনে আছে, ওই সময়ে তিনি ধারা বর্ণনা করেছিলেন চমৎকার দরাজ ও ভরাট কন্ঠে। সম্ভবত দুর্গা পূজার অনুষ্ঠানে। সঙ্গে প্রখ্যাত চিত্র পরিচালক দীলিপ সোমও ছিলেন। মহিষাসুর চরিত্রে অভিমন্যু শুর ও দুর্গা চরিত্রে মাধুরী চট্টোপাধ্যায় অপূর্ব অভিনয় করেছিলেন। তার আগের বছর মহিষাসুর ছিলেন সম্ভবত রণেন কুশারী (বিটিভির সাবেক পরিচালক, ক্যামেরা নিয়ন্ত্রক সমীর কুশারীর বাবা) এর দু-তিন বছর পর থেকে মহিষাসুর চরিত্রে প্রায় নিয়মিতই অমল বোস রূপদান শুরু করেন। কংস চরিত্রেও। আর এভাবেই তাঁর সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা নিবিড় হয়। মহিষাসুর চরিত্রে অমল বোসের একাগ্রতা রীতিমতো বিস্ময়কর। মনে পড়ে, ‘জয় মা দুর্গা’ আলেখ্যানুষ্ঠানে মহিষাসুরকে বধ করবেন দেবী দুর্গা শূলের আঘাতে। দুর্গার অভিনয়ে লিপি দাস। লিপির প্রচন্ড জোর আঘাতে ত্রিশূলের একটি অংশ মহিষাসুরের রয়েল ড্রেস ভেদ করে তার বুকে ঢুকে যায়। অমনি ভীষন চিৎকার মহিষাসুর অমল বোসের। অসহ্য যন্ত্রণায় কাতর অমল বোস অনেক কষ্টে মৃত্যু আর্তনাদের মধ্যে দিয়ে তাঁর সংলাপ বলে যান। দর্শক আসল ঘটনা বুঝতে পারে নি। তবে গ্রীনরুমে দেখা গেল যে, ত্রিশূলের আঘাত অমল বোসের বক্ষ ভেদ করে প্রায় অর্ধ ইঞ্চি ভেতরে ঢুকে গেছে। রক্ত বের হচ্ছে অবিরাম। নিষ্ঠাবান অভিনেতা বলেই হয়তো তিনি প্রচন্ড আঘাত সত্ত্বেও অভিনয়ে ক্ষান্ত হননি বরং অভিনয়কে জীবন্ত করে তুলতে পারার সুযোগ হাতছাড়া করেননি। সার্থক করেছেন এই সংলাপ উচ্চারণ করে, ‘মা, মাগো -এই নাও তোমার অধম সন্তানের বক্ষরঞ্জিত অঞ্জলি, ক্ষমিও নিজ গুণে মোর অপরাধ যত। মূলত মহিষাসুর চরিত্রে অমল বোস নিছক অভিনয় করেন নি, করেছেন বাস্তব জীবনের জয়গান যা মূর্ত হয়ে ওঠে করুণ রসধারায় সিক্ত হয়ে।
আমার প্রিয় বন্ধু কবি নির্মলেন্দু গুণ অনেক বছর আগে তার কলামে মন্তব্য করেছিলেন, ‘জীবন বিটিভি’তে দুর্গা পূজার অনুষ্ঠান করে হিন্দু ধর্মকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। এখন শুনলাম শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমীর অনুষ্ঠানও তিনি করেন। শুনে ভালো লাগলো। বাড়তি বিশেষণ যুক্ত হলো তার নামের আগে। সঙ্গে বাড়তি কামাই। আগে বলতাম দুর্গাপূজার নাট্যকার। এখন বলতে হয় জন্মাষ্টমীর নাট্যকার। ফলে প্রায় প্রতি বছরই নতুন নতুন ‘দুর্গা’ ও ‘রাধা’ আবিষ্কার করতে গিয়ে বেচারার যে ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। গুণের মন্তব্য আমার কাছে আংশিক সত্য বলে প্রতিপন্ন হতো। এখনো হয়। কারণ, আমি দুর্গাপূজার অনুষ্ঠানটিকে ধর্মীয় দৃষ্টিতে কখনো তেমনটি ভাবিনি, যেমনটি ভেবে থাকি সামাজিত-সাংস্কৃতিক দৃষ্টিকোণ থেকে।
দশ ভূজা দুর্গা সব দেবতার তেজে পুঞ্জীভূত সৃষ্টি, যেমনটি বলে থাকি আমরা- ‘দশে মিলে করি কাজ হারি জিতি নাহি লাজ’ কিংবা ‘দশের লাঠি একের বোঝা’। অর্থাৎ এক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক চেতনায় ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার উন্মেষ বড় হয়ে দাঁড়ায়, যার কারণে সংঘবদ্ধ অসুরকুল বিনাশ করতে দেবী দুর্গাকে প্রত্যক্ষ করি মহিষাসুর মর্দিনীরূপে। অন্যদিকে শ্রীকৃষ্ণ-রাধার রোমান্টিক নিষ্কলুষ প্রেম-উপাখ্যানকে প্রকৃতপক্ষে প্রকৃত মানব প্রেমের উজ্জ্বল ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে মেনে নিতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি বেশি। রাধা-কৃষ্ণের প্রেম সেতো জীবাত্মার সঙ্গে পরমাত্মার মিলন। তাই ওই অনুষ্ঠানগুলো করে আমি যে কেবল হিন্দু ধর্মকেই বাঁচিয়ে রাখছি এমন ধারনা আমার মনে বদ্ধমূল না হয়ে বরং মনে হয়, গোটা বিশ্বই সত্য সুন্দরের জন্য আসুরিক, অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়ছে।‘জীবে প্রেম করে যেইজন, সেইজন সেবিছে ইশ্বর’ -এই বাণী শাশ্বত চিরন্তন চেতনাতেই ভাস্বর।
তবে হ্যাঁ, আমি স্বীকার করি যে, দুর্গা চরিত্রে অভিনয় করাতে প্রায় প্রতি বছরই আমাকে বেশ সংকটে পড়তে হতো। এমনকি রাধা চরিত্রের বেলায়ও। এ প্রসঙ্গে মনে পড়ে, খুব ছোটবেলায় মায়ের সঙ্গে মামা-বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হ্ওয়ার সময় মাকে তিন-তিনবার ‘দুগগা’, নাম উচ্চারণ করে ঘরের মূল দরজার চৌকাঠে হাত বাড়িয়ে প্রণাম করতে দেখতাম। একবার জিজ্ঞেস করলাম মা ‘দুগ্গা’ কী? মা এভাবে বুঝাতেন যে দুগ্গা অর্থাৎ দেবী দুর্গা, তাঁকে ডাকলে মঙ্গল হয়। সে কবেকার কথা।
আজ যে বয়সটাতে প্রবেশ করেছি, সেই বয়সে দুর্গা সম্পর্কে আমার খুব সামান্য ধারণাই হয়েছে। তার সম্পর্কে জানার অনেক কিছুই রয়ে গেছে বাকি। তবুও বিটিভি কিংবা অন্যান্য টিভি চ্যানেলে বা মঞ্চে অনুষ্ঠান করার সুযোগে দুর্গা সম্পর্কে যৎসামান্য হলেও পড়াশোনা করতে হয় বৈকি! অনুষ্ঠান করতে গিয়ে প্রতি বছরই দুর্গা চরিত্রে অভিনয় করার মতো যোগ্য কাউকে পাওয়া সত্যি দুষ্কর ছিল। এক কথায় বাংলাদেশে ‘দুর্গা’ সঙ্কট বড্ড প্রকট। প্রায় প্রতিবারই একে ওকে ‘দুর্গা’ বের করার জন্য বলি। কেউ বলেন, না দাদা হলো না, একটা আছে অমুকের মেয়ে, দেখতে দুর্গার মতোই কিন্তু অভিনয় জানে না। কেউ কেউ সন্ধান দেন -অভিনয় পারে কিন্তু মেয়েটা দেখতে তেমনটি নয় তব্ওু যাচাই করতে পারেন। অর্থাৎ রূপ-গুণ-অভিনয়- এই তিনের সমন্বয়ে ‘দুর্গা’ খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন ছিল। রাধা চরিত্রের জন্যও অভিনেত্রীর অভাব কম নয়। তারপরও আমার নিজের চেষ্টা এবং শুভাকাঙ্খীদের সাহায্য, বিশেষ করে প্রযোজক মনোজ সেনগুপ্ত ও অভিনেতা চিত্তরঞ্জন রায় কর্মকার, তাপস সরকার প্রমুখের আন্তরিক প্রচেষ্টায় কমপক্ষে ২০ জন ‘দুর্গা’ ও ‘রাধা’ আবিস্কার করতে পেরেছি। এছাড়া সবদিক দিয়ে তৈরি ‘দুর্গা’ও ক’জন পাওয়া গেছে। বলা বাহুল্য, ‘দুর্গা’ পর্দা জুড়ে থাকেন। সহজেই দৃষ্টি আকৃষ্ট হয় সবার। ফলে যাদের দিয়ে অভিনয় করিয়েছি এ পর্যন্ত দুর্গা কিংবা রাধার চরিত্রে তাদের অধিকাংশই ছিলেন অবিবাহিতা। দুর্গা বা রাধার চরিত্রে অভিনয় করে ‘শিব’ বা ‘শ্রীকৃষ্ণে’র সন্ধান পেতে এদের তেমন সময় লাগেনি। এমনকি ভালো চাকরি পর্যন্ত। আমার জানা মতে অভিনয় শিল্পী ‘দুর্গা’দের অনেকেই এখন দিব্যি সুখ-শান্তিতে সংসার করছেন, ‘কৈলাশ’ -এ আছেন বলা যায়। দুর্গা চরিত্রে যারা রূপদান করেছেন তাদের মধ্যে শুভ্রা, চন্দনা, মিতালী, অরুণা বিশ্বাস, দীপা সাহা, রোজী মজুমদার, ভারতী আর্চায্য, কস্তুরী, সোমা মুখার্জী, জবা রায়, জয়শ্রী কর, রূপশ্রী সাহা, পূজা সেনগুপ্ত, শুক্লা দেবনাথ প্রমুখের নাম উল্লেখ করার মতো। রাধা চরিত্রে অভিনয় করেছেন কস্তুরী, সোমা মুখার্জী, লাক্সসুন্দরী শুভ্রা দাস, শ্রাবন্তী দত্ত তিন্নি, গোপা তালুকদার প্রমুখ। শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী অনুষ্ঠানে শ্রীকৃষ্ণের ভূমিকাই মুখ্য। কিন্তু কৃষ্ণ চরিত্রে অভিনয় করার মতো অভিনেতার অভাব বোধ করেছি। নায়ক সুব্রত অভিনয় করে প্রশংসিত হয়েছেন শ্রীকৃষ্ণ চরিত্রে। বহুবার অভিনয়ের কৃতিত্ব সুশান্ত শুভর। এখন ‘কৃষ্ণ’ আবিস্কার করতেও কষ্ট হবে। এদিকে বেতারে সবিতা ব্যানার্জীই সম্ভবত দুর্গা চরিত্রে দীর্ঘকাল ধরে অভিনয় করেছেন। তবে সম্প্রদায়ের বাইরে অরুণা হায়দারই বোধ করি একমাত্র শিল্পী যিনি ইটিভির দুর্গা পূজার অনুষ্ঠানে ‘দুর্গা’ হয়েছেন। এতে হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া হয়। আমাকে সম্মুখিন হতে হয় নানা প্রশ্নের। জড়াতে হয় নানান বিতর্কে। আমার স্পষ্ট জবাব, শিল্পীর কোন জাত থাকতে নেই। আমার এমন আরো যুক্তিসঙ্গত বক্তব্যে তর্কের ঝড় থেমে যায় ক্রমশ, বিশেষ করে অরুণা হায়দারের দুর্গা চরিত্রে অপূর্ব অভিনয় দক্ষতার কারণে। আগেই বলেছি যে, আমার মা সর্ব মঙ্গলের জন্যে দুর্গা নাম জপ করতেন, আর আমি তাঁর পুত্র হয়ে টিভি অনুষ্ঠানে দুর্গা চরিত্রের জন্য হন্য হয়ে দুর্গা খুঁজি। নিউইর্য়কে এসে অবস্থা একই। দুর্গা বা রাধা আবিস্কারের নেশাটা আমাকে আচ্ছন্ন করে রাখে। দৃষ্টি পড়ে থাকে সুন্দরীদের দিকে। মনে মনে ভাবি, ‘আগে দর্শনধারী পরে গুণ বিচারী’ অথাৎ সুন্দরীদের মধ্যে দুর্গা চরিত্রের আদল আছে কি না, তারপর না হয় অভিনয় কৌশলের বিষয়টা যাচাই করে নেয়া যাবে। জানিনা ওতে মঙ্গল অমঙ্গলের কী আছে, তবে আমার পাঁচ যুগের অভিজ্ঞতা বলে দেয়, দুর্গা সঙ্কটে দুর্গাপূজার অনুষ্ঠান সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে করা অবশ্যই কষ্টসাধ্য বিষয়। তাই দুর্গা সঙ্কট মোচনের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সকলকে গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে। তাছাড়া মহিষাসুর, রাধা-কৃষ্ণ চরিত্রে অভিনয় করার মতো যোগ্য শিল্পী তৈরীরও উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন।¬¬¬¬
লেখক: সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, নিউইয়র্ক।



Chief Editor & Publisher: Zakaria Masud Jiko
Editor: Manzur Ahmed
37-07 74th Street, Suite: 8
Jackson Heights, NY 11372
Tel: 718-565-2100, Fax: 718-865-9130
E-mail: ajkalnews@gmail.com
� Copyright 2009 The Weekly Ajkal. All rights reserved.