সোমবার , ১৮ ডিসেম্বর ২0১৭, Current Time : 11:45 pm




স্মৃতি গদ্য
জীবন খাতার একটি পাতায়

সাপ্তাহিক আজকাল : 22/09/2017

লাবলু কাজী :
ষড় ঋতুর দেশ এ বাংলাদেশ, ঋতুর বিবর্তনে প্রকৃতির বদলে যাওয়ার সাথে আমাদের জীবনের নানাবিধ পরিবর্তন লক্ষনীয়। যেমন রোজা প্রতি বছর পনের দিন এগিয়ে আসে। এবারও তার ব্যত্যয় নেই। শ্রাবনের ঝর ঝরো বাদল দিনে প্রবল বরিষনে খাল, বিল, নদী নালা জলে উপচে পড়ে। সে বছর রোজা আগষ্ট মাসে, রোজার বাইশে এ দিনের ভর দুপুরের সত্য কাহিনী। রোজা আমাদের দ্বার প্রান্তে এ উপলক্ষ্যে স্মৃতির পাথার থেকে নিঃসৃত এ হ্রদয় বিধারক কাহিনী আমার হ্রদয় ব্যথায় ভরাক্রান্ত, চোখ অশ্রু ভেজা আমার ব্যথার লাঘবে উপশমের ভান্ডার তো আপনারা, আপনাদের জন্য দুঃখ ভরা এ স্মৃতির নৈবদ্য!
রাতের শেষ প্রহর কনকনে শীত, বয়লারের গ্যাস হিট আমি লেপের নীচে। সকাল পাঁচটায় ঘুম ভেঙ্গে গেল। ঘুম ভেঙ্গে গেলে ঘুম আর ফিরে আসে না। এটা ঘুমের জেদ, ও আমাকে সম্ভবতঃ আর সুখ দিতে চাচ্ছে না। দীর্ঘ দিন সাহায্য করার পর আমার নিজের মতো হয়তো ওর জীবনেও হতাশা নেমে এসেছে, এজন্য এ ব্যত্যয় ধরা পড়ছে। নামাজের এখনও আনেক সময় বাকী আমি আর উঠলাম না বিছানায় শুযে শুয়ে ভাবছি, ভাবতে ভাবতে গ্রামের বাড়ী, পুরানো দিনের কথা মনে পড়ে গেল। চাহিদা এমন একটা জিনিস যা শত মনের ভিতর কষ্ট হলেও পূরন করতে হয়। নিজের মনের ভিতর বাহির দুটো জগত সামাল দিতে আমি দেখেছি কতো সুন্দর মেয়ে তাঁদের মনের বিরুদ্বে বাপ মার চাহিদার খোরাক মেটাতে মনের কষ্ট বুকে চাঁপা দিয়ে হাঁসি মুখে হবু বরকে বরন করে শ্বশুর বাড়ী যেয়ে ঘর সংসার করে জীবন চালিয়ে নিচ্ছে।
গ্রাম বাংলার সেই হাঁসি খুশী ছেলে আমিও গ্রামের মায়া ছেয়ে একবারে রসহীন, শুষ্ক মরুভূমির দেশ দুবাইতে চলে এলাম। পয়সা তার তো দরকার আছেই আমিও সেই অবলা নারীর মতো প্রয়োজন মেটাতে চলে এলাম। ক্ষেত খামার বিহীন আমাদের এলাকার লোকদের অন্য আর কি অবলম্বন থাকতে পারে বড়লোক হওয়ার? সেজন্য গ্রামগুলোর চিত্র পরিবর্তন নজর কাঁড়ে, পয়সা আছে বলেই প্রত্যেকটা বাড়ীতে কুঁড়ে ঘরের পরিবর্তে পাকা দালান উঠছে, এটাকে খারাপ বলবো না, ভালই তো কিন্তু ইটের পাঁজরে লোহাড় খাঁচায় দারুন মর্মব্যথার সুর শুনি। এই ধারার গড্ড প্রবাহিকার সমতা আনায় আমরা অনেকে এখন পরবাসে। সৌখিন জীবনের অভ্যাস, বড় বড় মাছ, নামী দামী ব্রান্ডের কাপড় কেনা, ছুটিতে এসে সবার মনোরঞ্জনে সমস্ত পয়সা শেষ করে, ঋন করে দেশ থেকে ফিরে এসে আগের কূন্য অবস্থায় থাকা এভাবেই চলে আসছে আমাদের জীবন। এটা আমরা প্রবাসীরা নিজেরাই সৃষ্টি করেছি, কষ্ট আমাদের তো পেতেই হবে! হারাচ্ছি নিজের যৌবন, স্ত্রীর অধিকার এবং শিশু বাচ্চাকে বঞ্চিত করছি তার প্রাপ্য ভালোবাসা ও আদর হতে।
ছোট চাচা কতই বা বয়স হবে তার দোহা, কাতার প্রবাসী ভালই রোজগার করেন তিনি আগষ্টে দেশে এসেছেন ছুটিতে। আসার পর প্রথম দিন মানে ফুরফুরা মন, নতুন করে পুরানো রোমান্স, বিবাহিতরা এতদিন পর আসা, কখন বিছানায় যাবো যাবো ভাব, হানিমুনের অপেক্ষা আর সইছে না…। এ আগস্ট মাসেই আমার বাবা যিনি সম্ভবতঃ ত্রিশ বারের বেশী কথা বলেননি তাঁর ছেলের সাথে, যার নির্ভীক সাহস গ্রামের লোকদের অনুপ্রাডুত করতো সকল কাজে, স্বল্প ভাষী, সত্যবাদী এ মানুষটি সবার অলক্ষ্যে অভিমানের ভারে চির দিনের জন্য চলে গেলেন না ফেরার দেশে। আমার বুকের ভিতরটা এখনো চিনচিনিয়ে হার্ট এটাকের ব্যথার কষ্ট দেয় এজন্য আমার শিশুর মতো বাবাকে ছেলে হিসেবে কিছুই করতে পারিনি। আমাদের ভাল সময়ের কিছুই উপভোগ বা দেখে যেতে পারলেন না। বিত্ত দিয়ে যদি সুখ কেনা যায় সেটা ওনি দেখে যেতে পারেননি!
লাবনী চাচাতো ছোট বোন ফুটফুটে চাঁদের মতো সুন্দর, দেখতে যেনো এঞ্জেল, অনেকে বলেন আমার মেঝ বোন হাছনা আপার মতো, গ্রামে যেমন আপার রূপের প্রশংসা ছিল, তেমনটি বাচ্চাদের মধ্যে লাবনীর প্রশংসা ছিল। ওই দু বছরের শিশু বাচ্চা কোলে এসে বুকের সাথে লেপটে থাকতো, অন্যেরা জোর করে নিতে পারতো না। বুনা ফুপু বলতেন তোর কাছে ওকে বিয়ে দোব। আমি বলতাম দূর ফুপু আপনার যে কথা ওর চেয়ে আমি কতো বড় বয়সে, তা কি হয়! ওনি বলতেন রহিম বাদশাহ, রূপবাণের মতো হবে। এতো ভাল পাত্র আমরা হাত ছাড়া করতে পারিনা। সেই লাবনী ঘর ভরা মানুষ থাকতেও কখন, কিভাবে দিন দুপুরে হালটের পানিতে ডুবে মারা গেল আমার বোধগম্য হয় না। আমি তখন প্রবাসে ভাবি ওর নিথর ছোট্ট দেহটা যখন পানি থেকে উঠানো হলো, কি করুন সেই দৃশ্য, উঠিয়ে আনা, কবরে রেখে আসা, কাকা বাবা হিসেবে তাঁর অনুভূতি আমি উপলব্ধি করতে পারি, কষ্ট হয়, করার কিছু নেই। মা বলতেন “আল্লাহ্র জান তাঁর মাল তিঁনি নিয়ে গেছেন যাকে যখন পছন্দ হয়।
আমায় সব সময় একটা ব্যাপার প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয় এবং এর সঠিক গ্রহনযোগ্য উত্তর আজও পেলাম না দু বছরের শিশু ঘন্টারও বেশী সময় যাবৎ সবার আঁড়ালে অথচ এক জন লোকেরও খেয়াল হলো না এ মাছুম বাচ্চা কি করছে এবং কোথায় ব্যাপারটা আমি মেনে নিতে পারিনি। তাঁরা কি এতই আনন্দে মত্ত ছিলো যে লাবনী তাদের কাছে মূল্যহীন হয়ে পড়ে। এ চরম অবহেলা বাচ্চার প্রতি এবং অনৈতিক মানবিক দিক থেকে দেখতে গেলে, যার ক্ষমা নেই!
লাবনী বেঁচে থাকলে এখন কতো বড় হতো? পূর্ণ যৌবনার ভারে সে হয়তো স্বর্গের অপ্সরা বনে যেতো। হয়তো কারো স্ত্রী, করো মা হতো আমার ভাবতে ভাল লাগে বড় হলে সে দেখতে কেমন হতো। কল্পনার ফানুস উড়িয়েও আমি এ জটিল অংকের সমাধান বের করতে পারিনা। আপনারা কেউ কখনো গোলাপ ফুল ফোঁটার আগের অবস্থায দেখেছেন, আমাদের বাসার সামনে লনে আছে, মাঝে মাঝে দেখি, ফোঁটার আগে পাঁপড়িগুলো ঝরে যায়। আমার খুব কষ্ট হয় এ ভেবে যে ওর পূর্ণাঙ্গ রূপ বিকশিত করার, দেখানোর সুযোগ এলো না। এ ভাবনা, এ চেতনা আমায় সব সময় কষ্ট দেয়, আমার বুকের ভিতর একটা অভাব বোধ, ‘সামথিং ইজ মিসিং’ কাজ করেÑ
আমার বুকের ভিতর রইলি তুই/ খুললো না সে ঝট/ ধরতে গেলে পিছিয়ে যায়/ রইলো দূর চিরন্তন!

লেখক: সাহিত্যিক, নিউইয়র্ক।



Chief Editor & Publisher: Zakaria Masud Jiko
Editor: Manzur Ahmed
37-07 74th Street, Suite: 8
Jackson Heights, NY 11372
Tel: 718-565-2100, Fax: 718-865-9130
E-mail: ajkalnews@gmail.com
� Copyright 2009 The Weekly Ajkal. All rights reserved.