সোমবার , ১৮ ডিসেম্বর ২0১৭, Current Time : 11:43 pm




গল্প
ছোট মা

সাপ্তাহিক আজকাল : 22/09/2017

শফিউল আলম
দেশে ফোন করেছিলাম। বোনের কাছে। কুশল সংবাদ নিতে।
ফোনটা উঠিয়ে প্রথম প্রশ্ন, কিরে, তোর ডায়রির পাতা ইদানীং খালি যাচ্ছে, কি হোল?
বললাম, বড় নিরামিষ যাচ্ছে দিনকাল। একঘেঁয়েমী। কোন বৈচিত্র্য নাই। খাও দাও আর ঘুমাও। এসব তো লেখা যায় না। অন্ততপক্ষে পাঠকের জন্য।
তাহলে ভুত-প্রেত নিয়ে লেখো। যেমন, হেঁটে আসছিস অন্ধকার রাস্তা দিয়ে। হঠাৎ খিলখিল করে হাসতে হাসতে এক বুড়ি তোর পথ আগলিয়ে ধরল। সুন্দরী মেয়ে বলব না, তাহলে তোর মেয়ে আমার মাথা ভেঙে দেবে।
ইয়ার্কি পেয়েছিস। তবে মনে পড়ছে একজনের কথা। ঐ যে বললি ভুত-প্রেত। দেখেছিলাম।
তবে শোন, আমার বয়স তখন পাঁচ। তোর তখনও জন্ম হয়নি। আমাদের বাসার পাশে মাঠ। মাঠের শেষে একটা টিনের ছাউনি দেওয়া বাড়ি। ওখানে থাকতো টুকু নামে আমার এক বন্ধু। আমরা এক বয়সী। ও থাকতো ওর মা আর ভাইয়ের সাথে। বাবা গত হয়েছে অনেক দিন হোল। আমি যেতাম ওদের বাড়ীতে। টুকুর সাথে মার্বেল খেলতে।
ওর ভাবীর গায়ের রঙ দুধে আলতা দিয়ে গড়া। টানা টানা চোখ। আমাকে দেখলে ডাক দিত। বলত, এই ছটকা এদিকে আয়।
আমি যন্ত্রের মত এগিয়ে যেতাম, কিসের যেন একটা টান অনুভব করতাম। কাছে এলে আমার গালটা টিপে দিত। কোলে বসিয়ে বলত, তোকে আমি মধু বলে ডাকব। আর তুই আমাকে ছোটমা বলে ডাকবি। কেমন?
কেন আমাকে মধু বলে ডাকবে? আমার নাম তো মিন্টু।
বলত, তুই যে আমার পরানের মধু। বলে আমাকে চেপে ধরত বুকের মাঝে।
আমি মুখ লুকাতাম ওর নরম বুকে।
তুই এখানে বস আমি আসছি, বলে উঠে গিয়ে নিয়ে আসত দুধ কলা। আমাকে নিজে হাতে খাইয়ে দিত।
কপালে চুমু দিয়ে বলত, কাল একবার আসবি তো?
বলতাম, কাল এলে কি খেতে দেবে?
মুড়ি, পাটালি।
আমি খুব পছন্দ করি মুড়ি, পাটালি।
একদিন আমি টুনিদের বাসায় এক্কা দোক্কা খেলছিলাম। পানির পিপাসা পাওয়াতে দৌড়ে বাসায় এসে দেখি ছোটমা বসে আছে মার পাশে। দুজনে গল্প করছে। আমাকে দেখে হাসল। ডাক দিল।
একেবারে ঘেমে নেয়ে গেছিস। বলে আঁচল দিয়ে আমার মুখটা মুছে দিল।
মা বলল, তোর খুব ন্যাওটা হয়েছে দেখছি।
আমি ওকে মাঝে মধ্যে দুধ কলা খাইয়ে দিই। তুমি কিছু মনে করো নাতো খালা?
না, আমি জানি কেন তুই ওকে এত ভালবাসিস।
আমি পানি খাওয়ার কথা ভুলে গিয়ে ওর গা ঘেঁসে বসলাম।
টুনি এসে ডাক দিল খেলতে যেতে।
বললাম, আজ আর খেলব না।
মা বলল, খেলবি না কেন? এখানে বসে আমাদের কথা শুনবি। তাই না?
বললাম, আমার আর খেলতে ইচ্ছা করছে না। আসলে ছোটমা’র পাশ ছেড়ে যেতে চাইছি না।
ছোটমা আমার চুলগুলো হিজিবিজি করে দিয়ে বলল, যা পাজি, খেলতে যা।
আমি অনিচ্ছা সত্ত্বেও উঠে গেলাম। এক্কা দোক্কায় আর মন বসলো না।
দুদিনের জন্য মামা বাড়ীতে গিয়েছিলাম। ফিরে এসে দৌড়ে গেলাম টুকুদের বাড়ীতে। ছোটমা বসে আছে মাটির বারান্দায়। আমাকে ডাকল না। আমি পাশে গিয়ে বসলাম। আমার দিকে তাকাল। চোখে জল। আমি হাত দিয়ে চোখটা মুছিয়ে দিতেই আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠল।
বলল, তুই বাসায় যা। আজ তোকে আমি খাওয়াতে পারব না।
আমি খেতে চাইনা। আমি তোমার পাশে বসে থাকব। কি হয়েছে তোমার?
তুই বুঝবি না।
আমার কিচ্ছু ভালো লাগছিল না। বাসায় এসে মাকে বললাম, মা ছোটমা কাঁদছে কেন? ওকে বোধহয় কেউ মেরেছে।
মা বলল, না কেউ মারে নি। ওর বর টা আবার বিয়ে করেছে। ওর ঘরে সতীন এসেছে।
সতীন মানে কি, কিছুই বুঝলাম না। আর টুকুর ভাইকে তো ছোটমা অনেক ভাল করে খাওয়াত। তাহলে আবার বিয়ে করবে কেন?
সেই রাতে আমার ঘুম এলো না। সকালে উঠেই গেলাম ওদের বাড়িতে। ছোটমা’র এমন অগ্নিমূর্তি আগে কখনো দেখিনি। হাতে একটা চেলা কাঠ। সামনে একটা মেয়ে দাঁড়ান। কালচে গায়ের রং। পরনে লাল শাড়ী। মুখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে কথা বলছে। ছোটমা তাকে বেরিয়ে যেতে বলছে বাড়ি থেকে। ছোটমা চেলাকাঠ নিয়ে এগিয়ে যেতেই চোখ পড়ল আমার উপর।
দু’ পা পিছিয়ে এসে আমাকে বলল, এখানে কি করছিস। বাসায় যা। বলে একটা ধমক দিল।
দুই-তিন দিন যাইনি ঐ বাসায়। এক সকালে টুকু এসে হাজির। বলল, চল এখুনি আমাদের বাসায়।
কেন?
গেলেই দেখতে পারবি। বলল সে।
গিয়ে দেখি আমার মত বেশ কিছু ছেলে মেয়ে আর বয়স্ক কিছু লোকজন, সাথে টুকুর ভাই দাঁড়ানো।
ছোটমা’র ঘর বন্ধ। মাঝে মাঝে ঐ ঘর থেকে মোটা গলার স্বরে কে যেন কি বলছে। কিছুই বুঝলাম না।
হঠাৎ করে ঘরের ভিতর জিনিস পত্র ছুড়ে ফেলার শব্দ হোল । তারপর সব চুপ।
আমি টুকুকে জিজ্ঞেস করলাম, কি হয়েছে রে। আমার ভয় করছে।
টুকু বলল, ভাবীকে জিনে ধরেছে।
জিন মানে?
আমি জানি না। ভাই তো তাই বলল।
আবারও ঘরের ভেতর থেকে কর্কশ গলায় ভাইকে আসতে বলল দরজার কাছে। টুকুর মা ওর ভাইকে যেতে বারণ করলো, যাসনে খোকা।
দরজাটা কেঁপে উঠল। ভিতর থেকে বলল, আমি আজ যাচ্ছি। আবার আসব। ওর দিকে যতœ নিবি।
টিনের ছাদে শব্দ হোল। দরজা খুলে গেল। ছোটমা বেরিয়ে এসেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল মাটিতে।
আমি চিৎকার করে কেঁদে উঠলাম।
পরদিন সকালে গেলাম ছোটমা’র বাসায়। ছোটমা উঠানে বসে চুল শুকাচ্ছে। আমাকে দেখে বলল, আয় আমরা কোলে আয়।
পাশে বসতেই আমাকে টেনে নিল কাছে। মাথার চুলে আঙুল বুলাতে বুলাতে বলল, মুখটা শুকনো কেন রে?
আমি কথা না বলে ছোটমার বুকের কাছে মাথাটা নামিয়ে দিলাম। ওর সদ্য গোসল করা শরীরের গন্ধ আমার ভালো লাগছিল।
বললাম, ছোটমা তুমি তো মরে গিয়েছিলে। ঐ লোকটা আবার আসবে?
না রে পাগল ছেলে, ও আমাকে কিছু করবে না। ও আসে আমার ভালোর জন্য।
ছোটমা আমার কপালে চুমু দিয়ে বলল, তুই অনেকদিন আসিস না।
বললাম, কেন? এসেছিলাম, তোমার হাতে চেলাকাঠ। তুমিই তো বললে চলে যেতে।
ছোটমা হেসে বলল, একটু বস, গুড় দিয়ে ক্ষীর বানিয়েছি। তুই পছন্দ করিস তাই।
উঠে যেতে যেতে আমার গালটা টিপে দিয়ে গেল।
দু’মাস কেটে গেছে। এর মধ্যে অনেকবার ছোটমা অজ্ঞান হয়ে গেছে।
মাকে জিজ্ঞাসা করতাম, মা ছোটমার খারাপ কিছু হবে নাতো?
মা বলত, না তোর ছোটমা ভালো থাকবে। কিছু হবে না তোর ছোটমা’র। মা আমাকে আশ্বাস দিত।
একদিন বাবা এসে বলল তার বদলির চিঠি এসেছে। সামনের মাসে চলে যেতে হবে এখান থেকে। আমি শুনলাম। সারা বাসা ঘুরে ঘুরে কেঁদে বেড়ালাম। ছোটমা’কে বলিনি। শুধু গিয়ে গিয়ে আদর নিয়ে এসেছি।
এবার সময় হোল বলার। আমি এলাম। ছোটমা রান্নাঘরে। পরনে হাল্কা হলুদ রঙের শাড়ি। আমাকে দেখে বলল, কি ব্যাপার সোনা, এত সকালে?
তোমার সাথে কথা আছে ছোটমা। বলতে যেয়ে আমার চোখ দিয়ে পানি ঝরে পড়ল। জড়িয়ে ধরলাম ছোটমাকে।
ছোটমা চুলা থেকে হাড়িটা নামিয়ে রেখে আমাকে নিয়ে এল বারান্দায়।
মুখটা উঁচু করে ধরে বলল, কেউ বকেছে?
না।
তাহলে?
আমরা চলে যাচ্ছি ছোটমা। বলে হু হু করে কেঁদে উঠলাম।
চলে যাচ্ছি মানে?
বাবা বদলি হয়ে গেছে। সামনের সপ্তাহে গাড়ী আসবে নিয়ে যেতে। তোমার সাথে আর দেখা হবে না ছোটমা।
ছোটমা আমাকে ওর বুকের মাঝে চেপে ধরল। কোন কথা বলল না। ওর শাড়ি ভিজে গেল আমার চোখের জলে।
তারপর আমাকে চুমু দিয়ে বলল, তুই অনেক বড় হবি। বড় হয়ে আমাকে দেখেতে আসবি। আমি তোর পথ চেয়ে থাকব।
আর দেখা হয়েছিল? ফোনের ওপার থেকে বোনের জিজ্ঞাসা।
না। গিয়েছিলাম পঁচিশ বছর পরে কঙ্কনাকে নিয়ে। সেই জায়গা আমি চিনতে পারি নি। সব বদলে গেছে। অনেককে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। কেউ কোন খোঁজ দিতে পারেনি।
আমার ছোটমা হারিয়ে গেল। আমারই দোষ। আমি আমাকে নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। তাকে দেয়া কথা আমি রাখিনি। সে শুধু আমার পথ চেয়েই রইল। আমার পায়ের শব্দ শুনতে পেলনা।
এখনও মাঝে মাঝে যখন একলা বসে থাকি, মনে হয় কে যেন আমার গালটা টিপে দিয়ে বলছে
মধু আমার, আয়, দুধ কলাটা খেয়ে নে।
লেখক: গল্পকার, নিউইয়র্ক।



Chief Editor & Publisher: Zakaria Masud Jiko
Editor: Manzur Ahmed
37-07 74th Street, Suite: 8
Jackson Heights, NY 11372
Tel: 718-565-2100, Fax: 718-865-9130
E-mail: ajkalnews@gmail.com
� Copyright 2009 The Weekly Ajkal. All rights reserved.