সোমবার , ১৮ ডিসেম্বর ২0১৭, Current Time : 1:54 am




দেশ জনগণের না ব্যক্তিবিশেষের
‘আমরা’ বনাম ‘আমি’

সাপ্তাহিক আজকাল : 01/09/2017

ষোড়শ সংশোধন বাতিল করে সুপ্রীম কোর্টের ফুল বেঞ্চ যে রায় দিয়েছে এবং সেই রায়ের পর্যবেক্ষণে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা যে সব মন্তব্য করেছেন তার বিরুদ্ধে ক্ষমতাসীনদের ক্ষোভের প্রধান কারণের একটি হচ্ছে ‘আমরা’ ও ‘আমি’ত্বের সংঘাত। বিরোধী দলবিহীন বাংলাদেশের নিরুত্তাপ রাজনৈতিক ময়দানে এখন ঝড় বইছে ষোড়শ সংশোধনী বাতিল ও প্রধান বিচারপতির ‘পর্যবেক্ষণ’ নিয়ে। ঝড়টা নিঃসন্দেহে পুরোপুরি একতরফা। ঝড়টি তুলেছে ক্ষমতাসীন সরকার, বলা যায় খোদ সরকার প্রধান শেখ হাসিনা। তাদের প্রতিপক্ষ কোন বিরোধী রাজনৈতিক দল নয়, বিরোধী কোন মহলও নয়। তাদের প্রতিপক্ষ বিস্ময়করভাবে বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট, তথা দেশের বিচার বিভাগ। দেশ এখন উত্তপ্ত বিচার বিভাগ বনাম সরকার সংঘাতে।
প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যেই ক্ষোভ প্রকাশ করে নানা কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। তার পারিষদ দল তার চেয়েও উচ্চকন্ঠে শতগুনে প্রধান বিচারপতিকে কটুক্তি করে চলেছে। এমনকি ধর্মনিরপেক্ষতার দাবীদার দলের নানা পর্যায়ের ব্যক্তিরা বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাকে সরাসরি ‘হিন্দু-মণিপুরি-উপজাতি’ ইত্যাদি হিসাবে আখ্যায়িত করছেন এবং শেখ হাসিনার বদান্যতাতেই তিনি প্রধান বিচারপতি পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন সে কথাও জোরেশোরে বলছে। আর তাদেরও অধস্তন আওয়ামী কর্মীরা নেমে গেছে রাস্তায় সুরেন্দ্র সিনহার পদত্যাগের দাবীতে। তারা যে ভাষায় দেশের ক্ষমতাসীন প্রধান বিচারপতিকে হুমকি-ধামকি দিচ্ছে তা নজীরবিহীন। প্রধান বিচারপতির বিরোধিতায় অংশ নিয়ে সবাইকে বিস্মিত করে দিয়েছে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট। সরকারি দলের কোন পর্যায়ের কেউ না হয়েও তারা স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে প্রধান বিচারপতি বিরোধী আন্দোলনে নেমে পড়েছে।
বিচার বিভাগের বিরুদ্ধে কোন দেশের সরকারের এমন যুদ্ধ ঘোষণার দৃষ্টান্ত আর আছে বলে আমাদের জানা নেই। প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে যে ধরনের কথা বলা হচ্ছে তার প্রতিটিই আদালত অবমাননার শামিল। সরকারি দলের না হয়ে অন্য কেউ এ ধরনের মন্তব্য করলে আদালত নিঃসন্দেহে স্বপ্রণোদিত হয়েই তার বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ আনতো। কিন্তু ক্ষমতাসীনদের দৌরাত্ম্যের কাছে আদালতকে অসহায় বলেই মনে হচ্ছে।
প্রধান বিচারপতি তার পর্যবেক্ষণে ‘আমিত্ব’ তত্ত্ব বর্জন করে ‘আমরা’ হিসাবে নিজেদের বিবেচনা করে দেশকে এগিয়ে নেয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়ে যেখানে বলেছেন, ‘কোন জাতি বা দেশ কোনও এক ব্যক্তিকে দিয়ে গড়ে ওঠে না কিংবা একজন দ্বারা তা গঠিতও হয় না’, এ কথাকে সরকার বঙ্গবন্ধু বিরোধী বক্তব্য হিসাবে অভিহিত করেছে। তাদের সোজা কথা বঙ্গবন্ধুর একক নেতৃত্বেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে এবং তার দ্বারাই আমাদের জাতিসত্তা গঠিত হয়েছে।
প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে সরকার বা সরকার সমর্থকদের এই সব বক্তব্য নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। লক্ষ্যণীয় যে, দেশের বিদগ্ধ মহল এই বিরোধে সরকারের পক্ষে অবস্থান নেননি। তারা স্পষ্ট করেই বলেছেন যে, ষোড়শ সংশোধনী বাতিল সংক্রান্ত সুপ্রীম কোর্ট ফুল বেঞ্চের ৭৯৯ পৃষ্ঠার রায় ও পর্যবেক্ষণ অনেকেই পুরোপুরি না পড়েই গলা ফাটাচ্ছেন। আবার যারা পড়েছেন বলে দাবী করছেন তারা এর অন্তর্নিহিত অর্থ অনুধাবনে ব্যর্থ হয়েছেন। প্রধান বিচারপতির পর্যবেক্ষণ ‘আমরা যদি সত্যিই জাতির জনকের স্বপ্নের সোনার বাংলায় বাঁচতে চাই, তাহলে অবশ্যই আমাদেরকে আমিত্বের আসক্তি এবং এই আত্মঘাতি প্রবণতা থেকে মুক্ত হতে হবে’-এর উল্লেখ করে তারা বলছেন, বঙ্গবন্ধু স্বাক্ষরিত ’৭২-এর সংবিধানের শুরুই হয়েছে ‘আমরা বাংলাদেশের জনগন’ দিয়ে। তিনি আমিত্বকে প্রশ্রয় দেননি। পরবর্তীতে ‘আমরা’র বদলে ‘আমি’ত্বের প্রচলন ঘটেছিল। সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক বলেছেন, ষোড়শ সংশোধনীতে সরকারের আমিত্ব ভাব বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়েছিল। ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের মধ্য দিয়ে সেই ‘আমিত্ব’-কে বাদ দেয়া হয়েছে।
বিচার বিভাগের বিরুদ্ধে সরকারের এই নজিরবিহীন ভূমিকা আমাদের শঙ্কিত করে তুলেছে। আমাদের প্রত্যাশা, সরকার সংযত হবে, বিচার বিভাগের ওপর থেকে তাদের কালো থাবা সরিয়ে নেবে।



Chief Editor & Publisher: Zakaria Masud Jiko
Editor: Manzur Ahmed
37-07 74th Street, Suite: 8
Jackson Heights, NY 11372
Tel: 718-565-2100, Fax: 718-865-9130
E-mail: ajkalnews@gmail.com
� Copyright 2009 The Weekly Ajkal. All rights reserved.